কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং নতুন প্রজন্মের পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও, একই সঙ্গে তা পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে। ইংল্যান্ডের পরীক্ষা ও যোগ্যতা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা অফকোয়াল সতর্ক করে বলেছে, স্মার্ট চশমা, অদৃশ্য ইয়ারপিস এবং ইন্টারনেট-সংযুক্ত অন্যান্য ডিভাইস পরীক্ষার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অফকোয়ালের প্রধান ইয়ান বকহ্যাম এক পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে নিয়ন্ত্রকদেরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তার ভাষায়, “আমরা সবাই মোবাইল ফোনের ঝুঁকি সম্পর্কে জানি। কিন্তু এখন তরুণদের মধ্যে এমন স্মার্টওয়াচ দেখা যাচ্ছে, যেগুলো পুরোপুরি ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে এগুলোও মোবাইল ফোনের মতো একই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।” তিনি জানান, ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি বাজারে আসছে, যার মধ্যে এমন স্মার্ট চশমাও রয়েছে- যা চশমার লেন্সের ভেতরে লেখা বা তথ্য প্রদর্শন করতে পারবে এবং তা শুধু ব্যবহারকারীই দেখতে পাবেন। ফলে পরীক্ষার হলে গোপনে তথ্য গ্রহণ করা আরও সহজ হয়ে যেতে পারে। বকহ্যাম বলেন, “আমাদের যোগ্যতা ও পরীক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় সম্পদের মতো। এটি যেন প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি
অফকোয়ালের তথ্যানুযায়ী, ইন্টারনেট-সংযুক্ত ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এর মধ্যে মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ, অদৃশ্য ইয়ারপিস এবং স্মার্ট চশমার মতো ডিভাইস রয়েছে। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মকালীন পরীক্ষায় জিসিএসই, এএস এবং এ-লেভেল পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত দুই হাজার ২২৫টি জালিয়াতির ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে মোবাইল ফোন ও স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের পর থেকে প্রতিবছরই এটি পরীক্ষায় জালিয়াতির সবচেয়ে বড় বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বকহ্যাম বলেন, “যদি কোনও শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ বা অন্য কোনও ডিভাইসের সাহায্যে পরীক্ষায় অতিরিক্ত সুবিধা নেয়, তাহলে সে এমন নম্বর পেতে পারে যা প্রকৃতপক্ষে তার প্রাপ্য নয়।” তিনি আরও বলেন, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও গুরুতর। কারণ এতে একজন শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত গ্রেড তার প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা ও শেখার মানকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করবে না। ফলে পরীক্ষার ফলাফল এবং সনদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।
এআই ব্যবহারে উদ্বেগ
পরীক্ষা কক্ষের জালিয়াতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জমা দেওয়া কোর্সওয়ার্ক বা প্রকল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও উদ্বিগ্ন অফকোয়াল। বকহ্যাম জানান, ইংল্যান্ডের জিসিএসই ও এ-লেভেল পাঠ্যক্রম বর্তমানে সংস্কারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে এআই-সৃষ্ট কনটেন্টের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা এখন খুব গুরুত্ব দিয়ে এই প্রশ্নটি পর্যালোচনা করছি। যদি ভবিষ্যতেও এসব যোগ্যতার অংশ হিসেবে কোর্সওয়ার্ক রাখা হয়, তাহলে কীভাবে নিশ্চিত করা যায় যে, জমা দেওয়া কাজটি সত্যিই শিক্ষার্থীর নিজের তৈরি- সেটিই এখন মূল বিবেচনার বিষয়।” শিক্ষকদের কাছ থেকে অফকোয়াল বারবার এমন অভিযোগ পেয়েছে যে, এআই দ্বারা তৈরি লেখা শনাক্ত করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেরা না লিখে এআই ব্যবহার করে কাজ জমা দিচ্ছে কি না, তা নির্ধারণ করা অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কঠোর হতে পারে মূল্যায়ন পদ্ধতি
এআই ব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলায় সম্ভাব্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে অফকোয়াল। সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে কোর্সওয়ার্ক সম্পূর্ণ বাতিল করার বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটিকে ‘চূড়ান্ত বিকল্প’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পরিবর্তে শিক্ষকদের ভূমিকা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা যে কাজ জমা দেবে, তা অনুমোদনের আগে শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে আরও ঘন ঘন আলোচনা করতে পারেন এবং কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এছাড়া গবেষণা বা প্রজেক্টভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে সূত্র ও তথ্যসূত্র উল্লেখের নিয়ম আরও কঠোর করা হতে পারে। শিক্ষার্থীদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে তারা কোথা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং কোন উৎস ব্যবহার করেছে। বকহ্যাম উদাহরণ দিয়ে বলেন, “শিক্ষার্থীরা এমনটি করতে পারে না যে, তারা শুধু কোনও এআই চ্যাটবট খুলে লিখল-‘হেনরি অষ্টমের বৈদেশিক নীতি নিয়ে ১০ হাজার শব্দের একটি প্রবন্ধ লিখে দাও’-এবং সেটিই নিজেদের কাজ হিসেবে জমা দিল। এটি কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
শিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে এসব প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহজ ও সমৃদ্ধ করছে, অন্যদিকে মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এমন মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীর মৌলিক চিন্তা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং বাস্তব দক্ষতা যাচাই করা সম্ভব হবে। ইংল্যান্ডের শিক্ষা নিয়ন্ত্রকদের এই সতর্কবার্তা বিশ্বজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এআই ও স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার যত বাড়বে, পরীক্ষার সততা রক্ষার চ্যালেঞ্জও তত জটিল হয়ে উঠবে।