২০২০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের করাচিতে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষেরা একটি মহাসড়কে ঘটে যাওয়া গণধর্ষণের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন এবং নারী ও শিশুদের ওপর হওয়া সব ধরণের নির্যাতনের নিন্দা জানিয়ে হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বা ফেস্টুন ধরে রেখেছিলেন। পাকিস্তানের লাহোর-শিয়ালকোট মহাসড়কে তিন সন্তানের সামনে এক ফরাসি পর্যটককে গণধর্ষণের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন দেশটির উচ্চ আদালত। বুধবার পাকিস্তানের একটি আদালত আসামিদের আপিল খারিজ করে এই রায় দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি আবিদ মালহি, শাফকাত আলী। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত শক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের আপিল খারিজ করেন। এর আগে ২০২১ সালের মার্চে সন্ত্রাসবিরোধী আদালত এই দুই আসামিকে গণধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আসামিপক্ষ রায়কে অন্যায় দাবি করে এবং তদন্তে ঘাটতির অভিযোগ তুলে উচ্চ আদালতে আপিল করে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ফরাসি ওই নারী তার তিন সন্তানকে নিয়ে লাহোর থেকে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় মহাসড়কে জ্বালানি ফুরিয়ে আটকা পড়েন। সাহায্যের অপেক্ষায় তিনি গাড়ির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখেছিলেন।
এ সময় দুই আসামি গাড়ির কাচ ভেঙে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে বের করে আনে এবং বন্দুকের মুখে জিম্মি করে সন্তানদের সামনেই তাকে গণধর্ষণ করে। পরে তার কাছে থাকা টাকা, গহনা, ব্যাংক কার্ড লুট করে পালিয়ে যায়। এতে ভুক্তভোগী নারী ও তার শিশুরা মারাত্মক মানসিক আঘাতের শিকার হন। ঘটনার পর পুলিশ মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েক দিনের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করে। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তাদের ডিএনএ মিল পাওয়া যায়। শুনানির সময় ভুক্তভোগী নারী আসামিদের শনাক্ত করেন এবং শাফকাত আলী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। ঘটনাটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক নিন্দা ছড়িয়ে পড়ে। দোষীদের জনসমক্ষে ফাঁসির দাবি ওঠে। তবে ঘটনার পরদিন লাহোরের তৎকালীন এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। তিনি ভুক্তভোগীর ওপর আংশিক দায় চাপিয়ে প্রশ্ন তোলেন কেন তিনি গভীর রাতে সন্তানদের নিয়ে বের হয়েছিলেন। এই বক্তব্যকে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ হিসেবে দেখেন অনেকে। এর প্রতিবাদে করাচি, লাহোরসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং নারীদের নিরাপত্তা ও বিচার নিশ্চিতের দাবি ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, পাকিস্তানে নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও বিদেশি নাগরিকদের ওপর এমন ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান রয়েছে এবং সাধারণত ফাঁসির মাধ্যমে তা কার্যকর করা হয়।