চলমান যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে চলতি বছর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দৈনিক ৪৩ লাখ ব্যারেল (বিপিডি) কমতে পারে, যা মোট সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ। মাসিক তেলবাজার প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইইএ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে এখনও কোনও কার্যকর সমঝোতা হয়নি। ফলে বছরের বাকি সময়ের জন্য বৈশ্বিক তেল সরবরাহের পূর্বাভাস আরও কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। আইইএ বলেছে, “হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়ে এখনও কোনও চুক্তি না হওয়ায় বছরের বাকি সময়ের সরবরাহের পূর্বাভাস আমরা আবারও কমিয়েছি।”
নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে দৈনিক মোট তেল সরবরাহ নেমে আসতে পারে ১০ কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে। এটি চলতি বছরের জন্য আইইএর দেওয়া রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সর্বনিম্ন সরবরাহ পূর্বাভাস। এর আগে জুলাই মাসের প্রতিবেদনে আইইএ জানিয়েছিল, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ দৈনিক ৩৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। নতুন পূর্বাভাসে সেই ঘাটতির পরিমাণ আরও ৬ লাখ ব্যারেল বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে সংস্থাটির উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এর প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলবাজারে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাবেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আইইএ’র পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক তেলবাজারে সরবরাহ ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। যুদ্ধ ও পরিবহনপথে বাধার কারণে উৎপাদন ও রফতানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেল পরিবহনের সময় ও ব্যয়ও বাড়ছে। এর ফলে সরবরাহ সংকটের চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন পূর্বাভাসটি এমন সময়ে এলো, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেলবাজারের অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু তেলের দাম নয়, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পরিস্থিতির চাপ তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে। সব মিলিয়ে, চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। আইইএ’র সর্বশেষ পূর্বাভাস সেই ঝুঁকিরই নতুন মাত্রা তুলে ধরেছে।