তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান জন্মনিয়ন্ত্রণকে একটি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং দেশের জন্মহার কমে যাওয়াকে ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তুরস্কের শীর্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে তার ২৩ বছরের মেয়াদের বেশির ভাগ সময়ই তিনি তুর্কিদের বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি এমন এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের প্রচার চালিয়েছেন যেখানে বাবারা উপার্জন করবেন আর মায়েরা ঘরের পাশাপাশি অন্তত তিন বা তার বেশি সন্তান লালন-পালনে মনোযোগ দেবেন। সম্প্রতি এরদোয়ান বলেন, ‘কেন অন্তত চার বা পাঁচটি সন্তান নয়?’ তিনি মনে করেন, বেশি জন্মহার তুরস্ককে ‘ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালীভাবে এগিয়ে যেতে’ সক্ষম করবে।
তবে তার এই আহ্বান কাজ করছে না। তুরস্কের মোট প্রজনন হার (একজন নারীর গড় সন্তান জন্মদানের সংখ্যা) এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কমছে। বর্তমানে এই হার ২.১-এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে গেছে, যা কোনও দেশে অভিবাসন ছাড়া জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় স্তর। বিশ্লেষকদের মতে, এরদোয়ানের এই তৎপরতার পেছনে কেবল অর্থনৈতিক ভাবনাই নয়, তুর্কি সমাজের জন্য একটি রক্ষণশীল ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করছে। তার এই লক্ষ্য বা ভাবনায় সন্তান নিতে অনিচ্ছুক দম্পতি এবং এলজিবিটিকিউ দম্পতিদের কোনও স্থান নেই। এমনকি কর্মমুখী নারীদের জন্যও এতে সুযোগ সীমিত। ২০২২ সালে সংসদে এক নতুন সংসদ সদস্যকে দলে স্বাগত জানানোর সময় একটি টেলিভিশন লাইভ অনুষ্ঠানে এরদোয়ান এটি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন।
সেদিন সংসদ সদস্য মেহমেত আলি চেলেবিকে এরদোয়ান জিজ্ঞেস করেন, ‘সন্তান কয়টি?’ চেলেবি উত্তর দেন, ‘একটি।’ এতে প্রেসিডেন্ট অসন্তুষ্ট হন। চেলেবি তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে তার স্ত্রী পিএইচডি করেছেন এবং তিনি ক্যারিয়ার সচেতন। কিন্তু এরদোয়ান তাতে প্রভাবিত না হয়ে বলেন, ‘সন্তান হওয়াই হলো ক্যারিয়ার। আমাদের জনসংখ্যা বাড়াতে হবে। জনসংখ্যাতাত্ত্বিকরা এই হ্রাসের পেছনে নগরায়ন, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং বিশেষ করে নারীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার বিস্তারকে দায়ী করছেন। একই সঙ্গে তারা এরদোয়ানের অর্থনৈতিক নীতিমালার কারণে তৈরি হওয়া বর্তমান অর্থনীতিকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কম মজুরির কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে বাসস্থান, শিশু যত্ন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ইস্তাম্বুলের দুই সন্তানের মা ৪১ বছর বয়সী চিগদেম আকইউজ বলেন, ‘খাবার-দাবার খুবই ব্যয়বহুল।’ তিনি একটি তৃতীয় সন্তান নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু খরচ চালানোর সামর্থ্য না থাকায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন। এরদোয়ানের বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বানকে অবাস্তব উল্লেখ করে এই নারী বলেন, “তিনি বলেই যাচ্ছেন, ‘আরও সন্তান নাও! তিনটি বাচ্চা নাও!’ কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?”
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশই এখন জন্মহার কমে যাওয়ার সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে গেলে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেবে, পেনশন তহবিল দেউলিয়া হবে এবং অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে সেসব দেশের খুব কম শাসকেরই এরদোয়ানের মতো শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। তিনি মানুষের সন্তান জন্মদানের বিষয়টিকে নিজের ব্যক্তিগত মিশন হিসেবে নিয়েছেন। তুরস্কের প্রজনন হার বিশ্বের সর্বনিম্ন না হলেও এর পতন হয়েছে অত্যন্ত দ্রুত। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকেও এই হার ২.১ -এর ওপরে ছিল। ২০১৪ সালে এই হার শেষবারের মতো সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। ২০১৭ সালে তা প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে যায়। আর সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ সালে তা সর্বকালের সর্বনিম্ন ১.৪৮-এ এসে ঠেকেছে। এই জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি পরিবর্তনের আশায় এরদোয়ান সরকার সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার ২০২৫ সালকে ‘পরিবার বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত চলবে ‘পরিবার ও জনসংখ্যা দশক’।
চলতি মাসে সরকার মায়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ১৬ সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ২৪ সপ্তাহ এবং বাবাদের ছুটি ৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ১০ দিন করেছে। নতুন নীতি অনুযায়ী, প্রথম সন্তান জন্মের পর দম্পতিদের প্রায় ১১০ ডলার দেওয়া হচ্ছে। একের বেশি সন্তান থাকলে মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, দ্বিতীয় সন্তানের জন্য ৩৩ ডলার এবং পরবর্তী সন্তানদের জন্য ১১০ ডলার করে। তরুণ দম্পতিরা বিয়ের খরচ মেটাতে সুদমুক্ত ঋণের জন্য আবেদন করতে পারছেন। তবে অভিভাবকরা জানিয়েছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে সরকারের এই প্রণোদনা খুবই সামান্য। তুরস্কে গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশের নিচে নামেনি এবং কোনও কোনও সময় তা ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা পারিবারিক বাজেটকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ৩৮ বছর বয়সী জাহিদে এরতে তার চার মাস বয়সী চতুর্থ সন্তানের জন্য সরকার থেকে মাসে ১১০ ডলার পান। তার অন্য সন্তানরা এই সুবিধা চালুর আগে জন্ম নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই টাকায় কেবল ডায়াপারের খরচ চলে।’ তার স্বামী একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন এবং অধিকাংশ তুর্কির মতো ন্যূনতম মজুরি ৬২৫ ডলারের কাছাকাছি আয় করেন। গত মাসে তুরস্কের একটি বড় ট্রেড ইউনিয়ন জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতির কারণে ন্যূনতম মজুরি মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য ‘অপ্রতুল’।
জনসংখ্যাতাত্ত্বিকরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে সরকারের এই প্রণোদনা প্রজনন হারে বড় কোনও প্রভাব ফেলবে না। আঙ্কারা সোশ্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী সুতয় ইয়াভুজ বলেন, ‘আমার ধারণা, এগুলো মূল পরিস্থিতি বদলাতে পারবে না।’ তার মতে, বর্তমান প্রজন্মের তুর্কিরা আগের চেয়ে বেশি শহরমুখী, উচ্চ শিক্ষিত এবং সন্তান নেওয়ার আগে ক্যারিয়ার গড়তে চায়। ফলে বিয়ের বয়স বাড়ছে এবং সন্তানের সংখ্যা কমছে। তিনি আরও বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের নতুন তুর্কি পরিবারগুলো এক-সন্তানের পরিবারে পরিণত হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আয় এবং একটি সন্তান; এটাই এখন আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার সন্তানের জনক এরদোয়ান বছরের পর বছর ধরে তুর্কিদের অন্তত তিনটি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসলেও, পারিবারিক নীতি নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তারাও নিজেরা তা মেনে চলেননি। তুরস্কের পরিবার ও সমাজসেবা মন্ত্রী মাহিনুর ওজদেমির গোকতাস এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। তবে গত মার্চ মাসে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি জনসংখ্যা হ্রাসকে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ হলো পরিবার।
তিনি উল্লেখ করেন, অন্য দেশে যে জন্মহার কমতে ৯ দশক লেগেছে, তুরস্কে তা মাত্র ২৭ বছরে ঘটেছে। তবে তার নিজের সন্তান মাত্র দুটি। এক সাক্ষাৎকারে এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য লায়লা শাহিন উস্তা বলেন, জন্মহার বাড়ানো একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘তরুণ জনসংখ্যার কারণে আমরা একটি শক্তি হিসেবে টিকে আছি এবং শ্রমশক্তি, অর্থনীতি ও গতিশীলতার স্বার্থে আমরা এটি ধরে রাখতে চাই।’ তবে তিনি স্বীকার করেন যে তার মতো সচ্ছল ব্যক্তিরাই কম সন্তান নিচ্ছেন। পেশায় চিকিৎসক ও পরে রাজনীতিতে আসা লায়লার নিজের দুটি সন্তান রয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন অন্যদের তিনটি সন্তান নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘মানুষের এই চেতনা ধারণ করা উচিত যে দেশ ও জাতির স্বার্থে এটি প্রয়োজন।
এদিকে এরদোয়ানের পরামর্শ মেনে যারা বেশি সন্তান নিয়েছেন, তাদের জীবন কাটছে কষ্টে। ৩৯ বছর বয়সী ফাতমা আভচির ১০ ও ১৪ বছর বয়সী দুটি ছেলে এবং ১৩ বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করেন আমরা ছুটিতে বেড়াতে যাই কি না, আমি বলব, না।’ তার স্বামী একজন ইলেকট্রিশিয়ান। সন্তানদের বড় করতে ফাতমা চাকরি ছেড়ে দেন। তার সন্তানরা বড় হয়ে যাওয়ায় সরকারি অনুদানেরও সুযোগ নেই। পরিবারটি একটি মাত্র বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। ফাতমা ও তার স্বামী বেডরুমে ঘুমান আর সন্তানরা লিভিং রুমের সোফা ও বাঙ্ক বেডে ঘুমায়। তিনি বলেন, ‘আমরা সন্ধ্যায় একসঙ্গে টিভি দেখি এবং তারপর সবাই একই সময়ে ঘুমাতে যাই। কাউকে অতিথি হিসেবে দাওয়াত করার মতো অবস্থা আমাদের নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণ দম্পতিদের তিনি কয়টি সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দেবেন, এমন প্রশ্নে ফাতমা বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বড়জোর দুটি। কারণ জীবন চালানো এখন খুবই কঠিন।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস