দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নির্দশন হিসেবে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া তাদের যৌথ সীমান্তের ওপর দিয়ে প্রথম সংযোগ সড়ক সেতুটি চালু করেছে। এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুটি রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের খাসান এবং উত্তর কোরিয়ার তুমানগাং-এর মধ্যবর্তী তুমেন নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে। এটি দুই দেশের যৌথ সীমান্তের এমন এক প্রত্যন্ত ও জনবিরল এলাকায় অবস্থিত, যা সমুদ্র উপকূল থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সেতুটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন বলেন, এই নতুন সংযোগটি পর্যটনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের গতি বাড়াবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। মিশুস্তিন বলেন, আমি নিশ্চিত আন্তঃসীমান্ত পরিবহন অবকাঠামোর এই সম্প্রসারণ বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার আরও উন্নয়নে শক্তিশালী গতি সঞ্চার করবে। গত ২২ এপ্রিল স্যাটেলাইট চিত্রে নবনির্মিত এই সেতুটি দেখা যায়, যা উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথম সড়ক সংযোগ হিসেবে কাজ করছে। এর ঠিক ওপরেই রয়েছে ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ বা মৈত্রী সেতু, যা দুই দেশের মধ্যে একমাত্র রেল সংযোগ। ইউক্রেন যুদ্ধে রসদ সরবরাহের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন আশঙ্কার মধ্যেই মস্কো ও পিয়ংইয়ং তাদের প্রথম সড়ক সংযোগটি চূড়ান্ত করছে।
সড়ক সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে সোভিয়েত কর্মকর্তা ইয়াকভ নভিচেঙ্কোর নামানুসারে। দক্ষিণ কোরিয়াপন্থী একটি গোষ্ঠীর হত্যাচেষ্টা থেকে উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল-সুংকে রক্ষা করার কৃতিত্ব তারই। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর উভয় দিক থেকে যানবাহনের বহর সেতুটি অতিক্রম করে। রাশিয়া এবং গোপনীয়তা-প্রিয় উত্তর কোরিয়া সরকারের মধ্যে আগে থেকেই তুমেন নদীর ওপর একটি রেলসেতু এবং ভ্লাদিভোস্টক ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে নিয়মিত বিমান চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। ইউক্রেনের মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, এই সেতুটি হয়তো দুই দেশের মধ্যে গোপনে সামরিক রসদ পরিবহনের একটি করিডোর হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ইউক্রেনীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘ট্রুথ হাউন্ডস’ এটিকে উত্তর কোরিয়ার সেনা, নির্মাণকারী দল এবং সামরিক কর্মকর্তাদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার এবং একই সাথে রাশিয়ার প্রযুক্তি ও সম্পদ শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে বিপরীত দিকে পাঠানোর একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ করিডোর হিসেবে বর্ণনা করেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে জোরদার হয়েছে। ২০২৪ সালে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে মস্কোকে সহায়তা করার জন্য উত্তর কোরিয়া সেখানে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এর বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে বিমান-প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম, ড্রোন এবং গুপ্তচর উপগ্রহ প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৪ সালে রুশ পর্যটকদের জন্য দেশটি পুনরায় খুলে দেওয়ার পর থেকে উত্তর কোরিয়া অবকাশ যাপনের নতুন গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পায়। ওই সময় থেকে হাজার হাজার রুশ নাগরিক দেশটির নতুন চালু হওয়া সমুদ্র সৈকতের রিসোর্ট এবং স্কি করার স্থানগুলো পরিদর্শন করেছেন।
সর্বাত্মকবাদী বা একনায়কতান্ত্রিক উত্তর কোরিয়ার সাথে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এমনকি খোদ মস্কোতেও বিস্ময় ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত মাসে রুশ সম্প্রচারমাধ্যম আরবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক সাংবাদিক রাশিয়ার দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে প্রশ্ন করেছিলেন, কীভাবে দেশটি শেষ পর্যন্ত মাত্র উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের ওপর ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। লাভরভ এই ধারণার বিরোধিতা করে বলেন, এমন সঙ্গ পাওয়ার মধ্যে ভুল কিছু নেই। একই সময়ে রাশিয়ার কিছু ঐতিহ্যবাহী সহযোগী দেশ ইউক্রেনে মস্কোর অব্যাহত যুদ্ধ এবং এর ফলে পুরো অঞ্চলে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে ক্রমবর্ধমান হতাশা প্রকাশ করেছে।