শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৪শে শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৩ সফর ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: August 08, 2026
August 08, 2026
আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

ফোনবুকের সূত্র ধরে আসাদের গোয়েন্দাপ্রধানের সন্ধান মিলল মস্কোতে

Published: August 08, 2026 at 12:16 PM
ফোনবুকের সূত্র ধরে আসাদের গোয়েন্দাপ্রধানের সন্ধান মিলল মস্কোতে

সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনামলের অন্যতম ক্ষমতাধর গোয়েন্দা কর্মকর্তা হুসাম লুকার সন্ধান মিলেছে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে। একটি পুরোনো ফোনবুকের সূত্র ধরে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তার অবস্থান শনাক্ত করেছে বিবিসি। হুসাম লুকা সিরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের (জিএসডি) প্রধান ছিলেন। আসাদ সরকারের হয়ে নির্যাতন ও নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিল। আসাদ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্য অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতো লুকাও হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান। তার অবস্থান নিয়ে তখন থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। আসাদ সরকারের অপরাধের জন্য তাকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিও উঠেছে।


দামেস্কের বাড়িতে পাওয়া ফোনবুক

আসাদ সরকারের পতনের কয়েক দিন পর দামেস্কে লুকার পরিত্যক্ত বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালানোর সময় তার একটি নোটবুক পাওয়া যায়। সেখানে নীল কালিতে লেখা ছিল বহু মানুষের নাম ও ফোন নম্বর। তালিকায় দোকানদার, চিকিৎসক, সামরিক কর্মকর্তা এবং লুকা পরিবারের সদস্যদের নামও ছিল।বিবিসি ওই নোটবুকের ১৫৫টি নম্বরের ছবি সংগ্রহ করে। সেগুলোর মধ্যে ৫১টি নম্বর সচল পাওয়া যায়। এরপর সামরিক কর্মকর্তা ও আত্মীয়স্বজনসহ লুকার সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে হওয়া ব্যক্তিদের নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কেউ ফোন ধরেননি। কেউ কেউ লুকাকে চেনেন না বলেও দাবি করেন। পরে বিবিসির এক সাংবাদিক সিরিয়ায় গিয়ে ফোনবুকে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তাদের কয়েকজন চিকিৎসক হওয়ায় চিকিৎসা নেওয়ার অজুহাতে তাদের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করা হয়। একজন চিকিৎসক স্বীকার করেন, তিনি লুকার চিকিৎসা করেছিলেন। আরেকজন জানান, তিনি একসময় লুকার মায়ের সঙ্গে রাশিয়ায় চিকিৎসার কাজে গিয়েছিলেন। তবে কেউই লুকার অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে রাজি হননি।


দেহরক্ষীর কাছ থেকে নতুন সূত্র

মাসের পর মাস অনুসন্ধানের পর ফোনবুকে থাকা এক ব্যক্তি অবশেষে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি লুকার অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। তার কাছ থেকে লুকার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির ফোন নম্বর পাওয়া যায়।‘মাহমুদ’ নামে পরিচয় দেওয়া ওই দেহরক্ষী জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতন যখন আসন্ন, তখন লুকা তাকে বলেছিলেন যে তিনি দামেস্ক রক্ষা করতে থাকবেন। কিন্তু পরদিন ভোরে লুকা অদৃশ্য হয়ে যান। সঙ্গে করে অফিসের সিন্দুক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে গিয়েছিলেন বলেও মাহমুদ দাবি করেন।মাহমুদ লুকার পরিবারের কোনো যোগাযোগের তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি লুকার গাড়িচালকের একটি নম্বর দেন। ওই চালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও শুরুতে সফল হয়নি বিবিসি।


লেবানন হয়ে রাশিয়া

লুকার সম্ভাব্য পালানোর পথ খুঁজতে গিয়ে বিবিসি লেবাননের দিকেও নজর দেয়। লেবানন সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য, লুকা ভিন্ন নামে একটি ‘ভালো রুশ পাসপোর্ট’ ব্যবহার করে লেবানন হয়ে রাশিয়ায় উড়ে যান। এরপর লুকার ফোনবুকে থাকা লেবাননে অবস্থানরত এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিবিসি। তিনি লুকার একটি নম্বর দেন। নম্বরটির কান্ট্রি কোড ছিল রাশিয়ার। লুকার দামেস্কের অ্যাপার্টমেন্টেও রাশিয়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে রাশিয়ার বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া পুরস্কার এবং রাশিয়ার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পাঠানো নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড পাওয়া যায়।


ফোনে লুকার সঙ্গে কথা

রাশিয়ার নম্বরটি সত্যিই হুসাম লুকার কি না, তা যাচাই করতে বিবিসির সূত্র তাকে ফোনে যুক্ত করেন। অপর প্রান্তের ব্যক্তি এমন কিছু প্রশ্নের তাৎক্ষণিক ও সঠিক উত্তর দেন, যেগুলোর উত্তর লুকারই জানার কথা। পরে বিবিসি সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায়। পরিচয় দিয়ে তার বিরুদ্ধে গণহত্যা ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লুকা বলেন, তার বর্তমান অবস্থানে ফোনে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ। রাশিয়া তাকে কথা বলতে বাধা দিচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি কথা বলতে পারবেন না এবং বিষয়টি ব্যাখ্যা করাও সম্ভব নয়। রাশিয়ার বাইরে দেখা করার প্রস্তাবও তিনি কঠিন বলে জানান। এরপর ফোনটি কেটে দেন। পরে বিবিসি লুকার নামে ব্যবহৃত আরেকটি নম্বর পায়। ওই নম্বরের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এক দিনের মধ্যে মস্কোর উপকণ্ঠের দুটি এলাকায় তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। বিবিসি জানিয়েছে, রাশিয়ায় গিয়ে সরাসরি তার মুখোমুখি হওয়া সম্ভব হয়নি। ফোনে আবার যোগাযোগ করা হলে একই ব্যক্তি ফোন ধরে বিবিসির পরিচয় জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নেরও কোনো জবাব দেননি।


বিচারের অপেক্ষায় ভুক্তভোগীরা

সিরিয়ায় লুকার বিরুদ্ধে বিচারের দাবিতে সোচ্চার অনেকে। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আল-তুরবা বিবিসিকে জানিয়েছেন, লুকার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং নির্যাতনের ফলে মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। লুকার বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি বড় অংশ তার হোমস শহরে দায়িত্ব পালনের সময়ের। ২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় তিনি পলিটিক্যাল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের স্থানীয় প্রধান ছিলেন। বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সরকারি অবরোধের সময় খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছিল। ২০১৫ সালের ঈদুল আজহার দিন হোমসের আল-ওয়ায়ের এলাকায় একটি হামলায় ২৮ জন নিহত হন বলে সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ শিশু ও চার নারী ছিলেন। লুকা ওই এলাকায় হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে জড়িত ছিলেন বলে সিরিয়ার একটি মানবাধিকার সংগঠন ও তৎকালীন একটি সরকারবিরোধী সংবাদপত্র অভিযোগ করেছিল। পরে লুকা জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের প্রধান হন। তার অধীনস্থ নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী যোদ্ধা, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও মানবাধিকারকর্মীসহ সরকারের বিরোধী বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের আটক করত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেককে সেদনায়া কারাগারসহ সিরিয়ার রাজনৈতিক কারাগারে পাঠানো হতো; বহু বন্দীর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। লুকার সন্ধান পাওয়ার খবর সিরিয়ায় বিচারপ্রত্যাশীদের জন্য স্বস্তির হলেও তাকে রাশিয়া থেকে ফেরানো কঠিন হতে পারে। আসাদ সরকারের অন্যতম প্রধান মিত্র ছিল রাশিয়া। বিবিসি জানিয়েছে, লুকার অবস্থান এবং তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে রুশ সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।