সংঘাত নিরসনে রোমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে আলোচনা চলার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এ ঘটনায় এক মাসেরও বেশি সময় পর দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি দুই রিজার্ভ সেনা নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার নিহত দুই সেনা হলেন ৫৫তম ব্রিগেডের ২৮৫৫তম ব্যাটালিয়নের ৩৪ বছর বয়সী মেজর হারেল বিরেনস্টক এবং ৩৩ বছর বয়সী সার্জেন্ট মেজর তামির ভাকনিন।
জেরুজালেম থেকে এএফপি জানায়, দক্ষিণ লেবাননে গত ২৮ জুনের পর এই প্রথম ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে এলো।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ‘স্পষ্টভাবে লঙ্ঘনের’ জবাবে দক্ষিণ লেবাননে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। হামলার আগে দক্ষিণাঞ্চলের মানসুরি শহরের বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে উত্তর দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পৃথক একটি হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন।
আলোচনায়ও উত্তেজনা
রোমে চলমান আলোচনায় অংশ নেওয়া একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, বুধবারের আলোচনা নির্ধারিত সময়ের তিন ঘণ্টা আগেই শেষ করার অনুরোধ জানিয়েছিল ইসরাইল। ইসরাইলি প্রতিনিধিদলের প্রধান ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইটার লেবাননের পক্ষ থেকে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য ফাঁসের’ অভিযোগও তোলেন।
তবে বৃহস্পতিবার তৃতীয় ও শেষ দিনের জন্য আলোচনা আবারও শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইসরাইল ও লেবানন একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছায়। এতে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ, দক্ষিণ লেবানন থেকে ধাপে ধাপে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং পরীক্ষামূলক এলাকা বা ‘পাইলট জোন’ থেকে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মার্চে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে রকেট নিক্ষেপের পর লেবাননকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হয়। এর জবাবে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালায়। লেবাননের দাবি, ওই সংঘাতে চার হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
বাস্তুচ্যুত সাড়ে তিন লাখের বেশি
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা জানিয়েছে, সহিংসতা কিছুটা কমে আসায় আগের সংঘাতে বাস্তুচ্যুত আট লাখের বেশি মানুষ লেবাননে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে এখনো তিন লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত রয়েছেন।
টাইর শহর থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ইসরাইল সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত মানসুরি ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিকবার ইসরাইলি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। জুনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও এসব হামলা অব্যাহত ছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
২২ জুন মানসুরি পৌর কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের বাড়ি ফেরার অনুমতি দেয়। তবে ইসরাইলের ঘোষিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চলের’ আওতাভুক্ত এলাকায় না যাওয়ার জন্য তাদের অনুরোধ করা হয়। সীমান্তসংলগ্ন দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ইসরাইল ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের আলোচনায় ‘পাইলট জোন’ সম্প্রসারণ, সীমান্ত-সংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান এবং একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি ও নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে কাজ করা হবে।
রোমে আলোচনা চলাকালে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থক ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তেহরানকে হিজবুল্লাহর তৎপরতা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তাজানি আলোচনায় ‘বাস্তব ফল’ পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম মঙ্গলবার সরাসরি আলোচনাকে লেবাননের জন্য ‘লজ্জা ও অপমান’ বলে মন্তব্য করেন। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং অস্ত্র সমর্পণেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইসরাইল-লেবানন সমঝোতা এবং জুনে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রাথমিক চুক্তির পর লেবাননে সহিংসতা কিছুটা কমলেও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলের বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ, বিস্ফোরণ ও স্থাপনা ধ্বংসের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
মার্চের শুরুতে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলের ৩৮ জন সেনা এবং একজন বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।