দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন ঠেকাতে নতুন আইন করেছে সরকার। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বুধবার ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। গেজেট„ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে আইনটি কার্যকর হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে প্রায় ১৫৯ বছর আগে প্রণীত পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ বাতিল করা হয়েছে। নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংসহ বিভিন্ন ডিজিটাল অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ক্লাউড অবকাঠামো কিংবা ভিপিএনের মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা, বেটিং করা, জুয়ার অর্থ জমা, উত্তোলন বা স্থানান্তর করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিদেশি অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি, এজেন্ট বা সহযোগী হিসেবেও কাজ করা যাবে না।
সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন বেটিং পরিচালনা, বুকমেকার হিসেবে কাজ করা, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আদালত প্রয়োজনে দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলায় অংশগ্রহণ থেকেও বিরত রাখতে পারবেন। জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচারণা, স্পন্সরশিপ বা অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে জুয়ার প্রসারে অংশ নিলে গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী বা খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব বা অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। নতুন আইনে জুয়ার অর্থ ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা, ডিজিটাল ওয়ালেট, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর বা বৈধ করার চেষ্টাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতাভুক্ত অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আদালত অপরাধে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, মোবাইল ফোন, কম্পিউটারসহ সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা পাবেন। জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত ভবন, অফিস, কল সেন্টার বা সার্ভার অবকাঠামোও বাজেয়াপ্ত করা যাবে। কোনো কোম্পানি বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী করা যাবে। একই সঙ্গে আদালত প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত কিংবা বাতিলের নির্দেশ দিতে পারবেন।
আইনে বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়াসংক্রান্ত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। এসব অপরাধকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তদন্ত করবেন অন্তত উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা। আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেট সাময়িকভাবে জব্দ করতে পারবেন। এ ছাড়া অনলাইন জুয়া শনাক্ত ও প্রতিরোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন, ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেম ও ডেটা বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট, এনআইডি-সিম-এমএফএস সংযুক্তি, বায়োমেট্রিক যাচাই ও মুখমণ্ডল শনাক্তকরণভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর বিধানও রাখা হয়েছে। নতুন আইন বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, নির্বাচন কমিশন, সিআইডি ও জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনারও বিধান রাখা হয়েছে।