শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৫ই আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৩ মহররম ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: June 19, 2026
June 19, 2026
ভোলাহাট
ভোলাহাট

২০ দিনের রেশম চাষে লাখ টাকার স্বপ্ন সমরুদ্দিনের

Published: June 19, 2026 at 12:24 PM
২০ দিনের রেশম চাষে লাখ টাকার স্বপ্ন সমরুদ্দিনের

গোলাম কবির, ভোলাহাট (চাঁপাইনবাবগঞ্জ): একসময় দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে পরিচিত ছিল রেশম চাষ। নানা সংকট, বাজারের মন্দা ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিলেও এখনও কিছু মানুষ নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ধরে রেখেছেন এই ঐতিহ্য। তেমনই একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার চরধরমপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রেশম চাষি মো. সমরুদ্দিন। পূর্বপুরুষের হাত ধরে ছোটবেলা থেকেই রেশম চাষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মানুষটি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এখনও রেশম চাষকে জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে ধরে রেখেছেন।

মৃত আলতাব হোসেনের ছেলে মো. সমরুদ্দিনের সংসারে বর্তমানে পাঁচজন সদস্য রয়েছেন। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি এখনও রেশম চাষকে ভালোবেসে আগলে রেখেছেন। মেয়েদেরও রেশম চাষের কাজ শিখিয়েছেন এবং তাদের বিয়ে দিয়েছেন। বয়সের ভার থাকলেও তিনি এখনও নিজ হাতে রেশম পোকা পালন ও পরিচর্যার কাজ করে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি তাঁর পলু পালনের আদর্শ ঘরে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে সাজানো বাঁশের চাটাইয়ে হাজার হাজার রেশম পোকা খাবার খাচ্ছে। অত্যন্ত যত্ন ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে তিনি পোকাগুলোকে বড় করে তুলছেন। সমরুদ্দিন জানান, বছরে চারটি ক্রোপ (বন্দ) বা মৌসুমে তিনি রেশম পোকা পালন করেন। এর মধ্যে জৈষ্ঠ্য ক্রোপে ৫০০ থেকে ৬০০টি উন্নত জাতের ডিম সংগ্রহ করে পলু পালন করছেন।

তিনি বলেন, “পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে রেশম চাষ শিখেছি। অনেক কষ্টের সময় গেছে। একসময় রেশম চাষে লোকসানও হয়েছে। তারপরও হাল ছাড়িনি। এবার ভালো ফলনের আশা করছি। ৫০০ থেকে ৬০০ ডিম থেকে প্রায় ৬ মণ গুটি উৎপাদন হবে বলে ধারণা করছি।”

সমরুদ্দিন জানান, ডিম থেকে পলু এবং পলু থেকে গুটি উৎপাদন হতে প্রায় ২০ দিন সময় লাগে। এ মৌসুমে তার মোট উৎপাদন খরচ হবে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। সবকিছু অনুকূলে থাকলে গুটি বিক্রি করে এক লাখ টাকারও বেশি আয় হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “রেশম চাষ শুধু আমার পরিবারের আয়ের উৎস নয়, এটি এলাকার কয়েকজন অসহায় ও বিধবা নারীরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। বর্তমানে ৭ থেকে ৮ জন নারী নিয়মিত আমার এখানে কাজ করেন। তাদের খাবারের পাশাপাশি কাজের উপযুক্ত সম্মানীও দেওয়া হয়। এতে তাদের সংসার চালাতে কিছুটা সহায়তা হয়।”

সমরুদ্দিনের মতে, সরকারের সহযোগিতা এবং রেশম সম্প্রসারণ বিভাগের নিয়মিত তদারকি রেশম চাষকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, “উপ-পরিচালক মো. তরিকুল ইসলাম নিয়মিত আমাদের খোঁজখবর নেন। বাড়িতে এসে পরামর্শ দেন। কীভাবে রোগবালাই প্রতিরোধ করা যায়, কীভাবে বেশি ফলন পাওয়া যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। এতে আমরা অনেক উপকৃত হচ্ছি।”

বর্তমানে পলু থেকে গুটি উৎপাদনের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে অনেক পোকা গুটি তৈরি করেছে। সামনে গুটি সংগ্রহ ও বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছেন এই রেশম চাষি। প্রত্যাশিত ফলন পেলে মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে লাখ টাকার বেশি আয় হবে বলে আশাবাদী তিনি।

সমরুদ্দিন বলেন, “ডিম থেকে পোকা হয়েছে, এখন গুটি তৈরি হয়েছে। আর কিছুদিন পরই বিক্রি করা যাবে। মাত্র ২০ দিনে ভালো আয় করতে পারব—এই আশাতেই আমি ও আমার পরিবারের সবাই খুশি। যদি দাম ভালো পাই, তাহলে আরও বড় পরিসরে রেশম চাষ করব।”

এদিকে ভোলাহাট জোনাল রেশম সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. তরিকুল ইসলাম জানান, রেশম উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারিভাবে চাষিদের উন্নত ও জীবাণুমুক্ত ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উঠান বৈঠক, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমি নিয়মিত রেশম চাষিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর রাখি। তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করি। উন্নত প্রযুক্তি ও সঠিক পরিচর্যার কারণে এবার ভোলাহাট উপজেলায় রেশমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। সমরুদ্দিনের মতো অভিজ্ঞ চাষিরা ভালো ফলনের ব্যাপারে আশাবাদী।”

একসময় যে রেশম শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখত, সেই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সমরুদ্দিনের মতো নিবেদিতপ্রাণ চাষিরা এখনও সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তাদের পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা ও সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভোলাহাটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেশম শিল্প আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ও গৌরব ফিরে পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।