সোমবার ১৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৩রা কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও ১১৩ জন চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুষ্পাঞ্জলি ও সন্ধিপূজায় মহাষ্টমী উদ্‌যাপন চাঁপাইনবাবগঞ্জে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ডিআইজি ও পুলিশ সুপার, জোরদার নিরাপত্তা বিচ্ছেদের পর নতুন ছবিতে ধরা দিলেন শেহতাজ চীনের প্রত্যন্ত তৃণভূমিতে এআইয়ের বিশাল কম্পিউটিং কেন্দ্র, বদলে যাচ্ছে অর্থনীতি জেলেনস্কির সমালোচনায় ট্রাম্প, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পক্ষে সাফাই ভেনেজুয়েলার বিরোধী জোটের নেতা হিসেবে মাচাদোর প্রতি ফের সমর্থন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে তিন বিভাগ সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষার্থীদের বৃত্তির তথ্য এন্ট্রি ও সংশোধনে মাউশির নির্দেশ, সময়সীমা ১৯ নভেম্বর
Printed on: October 19, 2026
October 19, 2026
আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

চীনের প্রত্যন্ত তৃণভূমিতে এআইয়ের বিশাল কম্পিউটিং কেন্দ্র, বদলে যাচ্ছে অর্থনীতি

Published: October 19, 2026 at 02:29 PM
চীনের প্রত্যন্ত তৃণভূমিতে এআইয়ের বিশাল কম্পিউটিং কেন্দ্র, বদলে যাচ্ছে অর্থনীতি

চীনের প্রত্যন্ত তৃণভূমি অঞ্চল ইনার মঙ্গোলিয়ায় দ্রুত গড়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিশাল কম্পিউটিং কেন্দ্র। সস্তা বিদ্যুৎ, অনুকূল আবহাওয়া এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অঞ্চলটি বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। একসময় ‘আলুর রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত উলানচাব শহর এখন প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন গন্তব্য।

চীনের রাজধানী বেইজিং থেকে গাড়িতে প্রায় চার ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত উলানচাব। দ্রুত বিকাশমান উপকূলীয় শহরগুলো থেকে দূরে হলেও এ অঞ্চলে অ্যাপল, আলিবাবা, হুয়াওয়ে ও বাইটড্যান্সের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে।

২০২৬ সালের আগস্টে ইনার মঙ্গোলিয়ার কম্পিউটিং সক্ষমতা বেড়ে ৩ লাখ ৬৩ হাজার পেটাফ্লপসে দাঁড়িয়েছে। দুই বছরেরও কম সময়ে এ সক্ষমতা প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে অঞ্চলজুড়ে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য বড় ডেটা সেন্টার।

কেন ইনার মঙ্গোলিয়ায় এআই অবকাঠামোর বিস্তার?

এ অঞ্চলে ডেটা সেন্টার গড়ে ওঠার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। বছরের প্রায় ১০ মাস ঠান্ডা আবহাওয়া থাকায় সার্ভার শীতল রাখতে বাইরের বাতাস ব্যবহার করা যায়। এতে শীতলীকরণ ব্যয় কমে আসে।

এ ছাড়া বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম প্রায় ০.৩৫ ইউয়ান বা ৫.২ মার্কিন সেন্টে নেমে এসেছে। বেইজিংয়ের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে তথ্য আদান-প্রদানে বিলম্বও পাঁচ মিলিসেকেন্ডের কম, যা এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও দ্রুত ফলাফল তৈরিতে সহায়ক।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে বদলে যাচ্ছে উলানচাব

উলানচাব চাহার হাই-টেক উন্নয়ন অঞ্চলে অ্যাপল, আলিবাবা ও হুয়াওয়ের নামে সড়ক রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাইটড্যান্স, কুয়াইশৌ ও ভিনেট গ্রুপও সেখানে কার্যক্রম শুরু করেছে।

উন্নয়ন অঞ্চলের প্রশাসনিক কমিটির উপপরিচালক লিউ জুনপিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে কম্পিউটিং সক্ষমতাসংক্রান্ত ২২টি প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রায় ৩০ হাজার নির্মাণশ্রমিক কাজ করছেন।

ভিনেট গ্রুপের উলানচাব কার্যালয়ের নির্বাহী ঝৌ ইগুয়াং জানান, ২০২২ সালে তিনি যখন প্রথম এ অঞ্চলে জমি দেখতে যান, তখন এলাকাটি প্রায় জনমানবহীন ছিল। বর্তমানে সেখানে বড় আকারের কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে উঠছে।

ভিনেট গ্রুপ প্রায় ১ হাজার ১০০ মু বা ৭৩ হেক্টর জমিতে একটি কম্পিউটিং ক্লাস্টার তৈরির পরিকল্পনা করেছে। প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে।

ইনার মঙ্গোলিয়ার আঞ্চলিক রাজধানী হোহহটও এ খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত চীনের শীর্ষ ৩০টি বেসরকারি কম্পিউটিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ২০টি এ অঞ্চলে কার্যক্রম শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বিনিয়োগ ২০০ বিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে। চীনের শীর্ষ ১০টি কম্পিউটিং সেবা প্রদানকারীর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠানও এখানে কার্যক্রম স্থাপন করেছে।

বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা বড় চ্যালেঞ্জ

ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা। শুধু উলানচাবেই ২০২৫ সালে কম্পিউটিং শিল্পে ৪৩০ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২৬ সালে এ পরিমাণ বেড়ে ৯০০ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। উলানচাব চাহার হাই-টেক উন্নয়ন অঞ্চলে একটি শূন্য-কার্বন শিল্পপার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিতরণব্যবস্থা সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে।

উলানচাব পৌর উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের উপপরিচালক চেন ঝিগাং জানান, শিল্পপার্কের আশপাশে প্রায় ১০ গিগাওয়াট বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এ সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে বছরে ৩০০০ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিল্পপার্কটি সম্পূর্ণ হলে এর মোট বিদ্যুতের ৮০ শতাংশের বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসবে। অন্যদিকে, হোহহটের হোরিঙ্গার নিউ এরিয়ার কম্পিউটিং কেন্দ্রগুলো বর্তমানে তাদের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ সবুজ জ্বালানি থেকে পূরণ করছে।

পানির ব্যবহার কমাতেও বিভিন্ন প্রযুক্তি গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পানি ছাড়াই কার্যকর শীতলীকরণ ব্যবস্থা, বদ্ধ শীতলীকরণ টাওয়ার এবং বাইরের ঠান্ডা বাতাস ব্যবহার করে সার্ভার ঠান্ডা রাখার প্রযুক্তি।

ভিনেট গ্রুপের কারিগরি পরিচালক লি ই জানান, তাদের উলানচাব কম্পিউটিং কেন্দ্রে শীতলীকরণের কাজে ব্যবহৃত সব পানি পুনর্ব্যবহৃত। এতে স্থানীয় প্রাকৃতিক ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হচ্ছে।

স্থানীয় পানি সম্পদ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উলানচাবের বড় ডেটা কোম্পানিগুলো ১৫ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি ব্যবহার করেছে, যা শহরটির মোট পানিব্যবহারের ০.৩৩ শতাংশ।

শুধু ডেটা সেন্টার নয়, ‘টোকেন অর্থনীতি’ গড়ার লক্ষ্য

কম খরচে বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা তৈরি করলেও ইনার মঙ্গোলিয়ার সামনে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এ অবকাঠামো থেকে কীভাবে আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা যায়।

উলানচাবের বিগ ডেটা প্রশাসনের উপপরিচালক লিউ হুয়ানসুও মনে করেন, শুধু সস্তা বিদ্যুৎ ও কম জমির দামের ওপর নির্ভর করলে অঞ্চলটি শেষ পর্যন্ত ‘সার্ভার কক্ষের মালিক’ হয়েই থেকে যেতে পারে। কারণ, চিপ, অ্যালগরিদম ও উন্নত এআই মডেলের মতো উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্য এখনো অনেকাংশে এ অঞ্চলের বাইরে তৈরি হচ্ছে।

এ সীমাবদ্ধতা কাটাতে কম্পিউটিং সক্ষমতাকে বাণিজ্যযোগ্য সেবা ও এআইভিত্তিক পণ্যে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ৩০ মে হোহহটের হোরিঙ্গার নিউ এরিয়ায় একটি টোকেন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়। এর লক্ষ্য, কম্পিউটিং সক্ষমতাকে পরিমাপযোগ্য ও বাণিজ্যযোগ্য সেবায় রূপ দেওয়া এবং এআইভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা।

হোরিঙ্গার নিউ এরিয়ার প্রশাসনিক কমিটির উপপরিচালক গুও জুইং বলেন, কম্পিউটিং সক্ষমতাকে এমন পণ্যে রূপান্তর করা প্রয়োজন, যার পরিমাণ নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও বাণিজ্য করা সম্ভব। এভাবে অবকাঠামোভিত্তিক আয় থেকে উচ্চমূল্যের এআই সেবার দিকে অগ্রসর হওয়া যাবে।

উলানচাবও এ লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে টোকেন উৎপাদন, লেনদেন ও এআই প্রয়োগকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

এআই মডেলের মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ, কথোপকথন তৈরি ও বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের সময় টোকেন ব্যবহৃত হয়। ফলে টোকেনের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে কম্পিউটিং সেবার মূল্য নির্ধারণ ও বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শিল্প ও কৃষিতেও বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার

কম্পিউটিং অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শিল্পে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রও বাড়াচ্ছে ইনার মঙ্গোলিয়া। হোহহটের দুগ্ধশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জীবপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ১০০টি এআই প্রয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে।

পশুপালন খাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। স্মার্ট পশুচারণভূমিতে গবাদিপশুর মুখমণ্ডল শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে, যা পশু শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করছে।

সব মিলিয়ে, সস্তা বিদ্যুৎ, অনুকূল আবহাওয়া এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা কাজে লাগিয়ে ইনার মঙ্গোলিয়া দ্রুত এআই কম্পিউটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। তবে এ অবকাঠামোকে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিসেবা ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করাই এখন অঞ্চলটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।