ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন লিওনেল মেসি। তাঁর বাঁ পায়ে মুগ্ধ হয়েছে পৃথিবী, তাঁর কীর্তিতে বারবার নতুন করে লেখা হয়েছে রেকর্ডের গল্প। কিন্তু মেসির গল্পের শুরুটা কোনো আলোকোজ্জ্বল স্টেডিয়ামে নয়, আর্জেন্টিনার রোজারিওর এক সাধারণ পরিবারে। সেই গল্পের নেপথ্যে ছিলেন একজন বাবা। ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতেন, দিনের পর দিন পরিশ্রম করতেন, রাতে ফিরতেন পরিবারের কাছে। নিজের জন্য বড় কোনো স্বপ্ন ছিল না তাঁর। চাওয়া ছিল একটাই সন্তানদের ভালো ভবিষ্যৎ। সেই মানুষটির নাম হোর্হে হোরাসিও মেসি। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে ৬৮ বছর বয়সে শনিবার মারা গেছেন মেসির বাবা। তাঁর বিদায়ে শুধু একটি পরিবার নয়, শূন্য হয়ে গেল লিওনেল মেসির জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। কারণ মেসির গল্প যতটা একজন অতিমানবীয় ফুটবলারের, ততটাই একজন বাবার, যিনি ছেলের প্রতিভায় বিশ্বাস করে নিজের পরিচিত জীবনকে বিসর্জন দিয়েছিলেন।
রোজারিওর সাধারণ বাবা
১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম হোর্হের। যৌবনে কাজ করেছেন ধাতব কারখানায়। জীবন ছিল সাদামাটা, কিন্তু পরিশ্রমে ভরা। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতেন, ফিরতেন রাতের খাবারের সময়। হোর্হে ও সেলিয়া কুচিত্তিনির সংসারে চার সন্তান লিওনেল, রোদ্রিগো, মাতিয়াস ও মারিয়া সল। সবকিছুই ছিল আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতো। পরিবর্তনটা শুরু হলো ছোট ছেলে লিওর পায়ে ফুটবল ওঠার পর। রোজারিওর গ্রানদোলিতে খেলত ছোট্ট লিও। নাতির প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন দাদি সেলিয়া। একদিন গ্রানদোলির কোচ সালভাদোর আপারিসিওকে তিনি বলেছিলেন, ‘জিততে চাইলে আমার নাতিকে খেলান, ও ম্যাচ বাঁচিয়ে দেবে।’ হোর্হে হয়তো তখন এসব শুনে হাসতেন। কিন্তু ছেলের মধ্যে যে অন্যরকম কিছু আছে, সে বিশ্বাস তাঁর ছিল।
ছেলের জন্য সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত
মেসির বয়স যখন খুব কম, তখনই ধরা পড়ে তাঁর গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। প্রয়োজন ছিল নিয়মিত চিকিৎসার। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ ছিল পরিবারের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি। হোর্হে তখন আকিন্দার কারখানায় কাজ করতেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে চিকিৎসার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে উঠছিল। এর মধ্যেই আসে বার্সেলোনার প্রস্তাব। সুযোগটি ছিল অবিশ্বাস্য, কিন্তু ঝুঁকিও ছিল বিশাল। ১৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে স্পেনে যেতে হবে। চাকরি, পরিচিত পরিবেশ, পরিবারের বড় একটি অংশ, সবকিছু পেছনে ফেলে অচেনা দেশে নতুন জীবন শুরু করতে হবে। হোর্হে তবু পিছিয়ে যাননি। পরে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘কাজের জায়গা ও একটি ফাউন্ডেশনের সহায়তায় দুই বছর পর্যন্ত লিওর চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব হয়েছিল। এরপর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তখন আর পেছনে ফেরার উপায় ছিল না।’ সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় মেসি পরিবারের ভবিষ্যৎ।
বাবার হাত ধরে বার্সেলোনায়
গ্রানদোলি থেকে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ, সেখান থেকে বার্সেলোনা। মেসির পথচলা তখন দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। ১৩ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে স্পেনে পাড়ি জমান তিনি। অচেনা শহরে কিশোর ছেলের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তাকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং ফুটবলের পথে এগিয়ে দেওয়া, সব দায়িত্বই কাঁধে নেন হোর্হে। পরিবারের সবাই একসঙ্গে যেতে পারেননি। ফলে নতুন জীবনের শুরুতে আনন্দের পাশাপাশি ছিল বিচ্ছেদও। তখন কেউ জানত না, রোজারিও থেকে বার্সেলোনার সেই যাত্রাই একদিন ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেবে।
বাবা থেকে হয়ে উঠলেন ম্যানেজার
বার্সেলোনায় মেসির উত্থান ছিল দ্রুত। যুব দল থেকে মূল দল প্রতিভাবান কিশোর ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। মাঠে যখন মেসি নিজের সাম্রাজ্য তৈরি করছেন, মাঠের বাইরে তখন তাঁর পৃথিবী সামলাচ্ছেন হোর্হে। পেশাদার এজেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ না থাকলেও ছেলের ক্যারিয়ার সামলাতে সামলাতে শিখে নেন। চুক্তি, আলোচনা, ক্লাব ও স্পনসরের জটিল হিসাব। একসময় তিনিই হয়ে ওঠেন মেসির প্রধান প্রতিনিধি। বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন থেকে শুরু করে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, বাবার উপস্থিতি ছিল প্রায় সর্বত্র। হোর্হের কাজ ছিল সহজ একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে, মেসি যেন মাঠে মনোযোগ দিতে পারেন, আর বাইরের পৃথিবীর চাপ যতটা সম্ভব তিনি নিজের কাঁধে নিতে পারেন।
পৃথিবী দেখেছে মেসিকে, হোর্হে থেকেছেন আড়ালে
ছেলের খ্যাতি যখন আকাশ ছুঁয়েছে, তখনও হোর্হে নিজেকে সামনে আনেননি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকার বাবা হয়েও তিনি ছিলেন অনেকটাই আড়ালে। মেসির ক্যারিয়ার, চুক্তি, ব্যবসা ও পরিবারের নানা বিষয় সামলানোর পাশাপাশি ছেলেকে মাঠের বাইরের অপ্রয়োজনীয় চাপ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মেসির ম্যানেজার কিংবা প্রতিনিধি হিসেবে হোর্হের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল না, তিনি ছিলেন মেসির বাবা। পৃথিবী যখন সেরা বলেছে, বাবা তখন ভুল খুঁজেছেন। হোর্হের সঙ্গে মেসির সম্পর্কের আরেকটি দিক ছিল আরও বিশেষ। বাবা কখনো ছেলের অন্ধ প্রশংসাকারী ছিলেন না। মেসির নিজের ভাষায়, হোর্হে ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় সমালোচকদের একজন। মেসি দুর্দান্ত ম্যাচ খেললেও বাবার চোখ এড়িয়ে যেত না ছোট কোনো ভুল। একবার মেসি জানিয়েছিলেন, ভালো ম্যাচের পরও তাঁর বাবা তাঁকে বলতেন, ‘একটা ভুল করেছ।’ পৃথিবী যখন মেসিকে সেরা বলছিল, তখন একজন মানুষ তাঁকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, আরও ভালো হওয়া সম্ভব।
মেসির বড় সিদ্ধান্তগুলোতেও ছিলেন হোর্হে
২০২১ সালে বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির দীর্ঘ সম্পর্কের অবসান ঘটে। ক্লাবের আর্থিক সংকটের মধ্যে চুক্তি নিয়ে জটিলতার পর ন্যু ক্যাম্প ছাড়তে হয় তাঁকে। সেই কঠিন সময়েও আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন হোর্হে। এরপর প্যারিস সেন্ত জার্মেইন, পরে ইন্টার মায়ামি, মেসির ক্যারিয়ারের বড় বাঁকগুলোর পেছনেও ছিল বাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মাঠে মেসি যত বড় হয়েছেন, তাঁর পাশে থাকা মানুষটির দায়িত্বও তত বড় হয়েছে।
বিশ্বকাপের সময়ও মন পড়ে ছিল রোজারিওতে
হোর্হের অসুস্থতা দীর্ঘদিনের। ২০২৬ বিশ্বকাপের সময়ও তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। মেসি তখন আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপের লড়াইয়ে। মাঠে দেশের হয়ে লড়ছেন, আর হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে রোজারিওতে অসুস্থ বাবা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলের পর তাঁর চোখের জল অনেকের নজরে এসেছিল। সেই মুহূর্তে মাঠের আনন্দের পাশাপাশি বাবাকে ঘিরে উদ্বেগও ছিল তাঁর মনে। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর দ্রুত রোজারিও ছুটে যান মেসি। প্রায় দুই মাস পর বাবার কাছে ফিরেছিলেন তিনি।
শেষ হলো বাবার লড়াই
রোজারিওতেই হোর্হের শেষ দিনগুলো কেটেছে। কখনো হাসপাতালে, কখনো নিজের বাড়িতে। পাশে ছিলেন স্ত্রী সেলিয়া। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত শনিবার থেমে গেল সেই লড়াই। ৬৮ বছর বয়সে বিদায় নিলেন হোর্হে মেসি।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পদ, সম্পদ কিংবা খ্যাতি ছিল না। ছিল তাঁর ছেলে। যে ছেলেকে ছোটবেলায় চিকিৎসার জন্য অচেনা দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ছেলেই একদিন হয়ে উঠেছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। বিশ্ব তাঁকে চেনে লিওনেল মেসি নামে। কিন্তু সেই মেসির গল্পের প্রথম অধ্যায়ে, স্টেডিয়ামের আলো জ্বলার অনেক আগেই, নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বাবা, হোর্হে হোরাসিও মেসি।