আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শোভাযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশ থেকে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার, মাতৃভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক অধিকার ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতসহ সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি জানানো হয়েছে। উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম ও মানঝি পরিষদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আয়োজনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আজ সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের পাওয়ার হাউস মোড় থেকে আদিবাসী নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে র্যালি শুরু হয়। র্যালিটি পশু হাসপাতাল মোড়, উদয়ন মোড়, পাঠানপাড়া, নিউমার্কেট ও সেন্টু মার্কেট রোড, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে দিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে র্যালিটি মিলিত হয়। র্যালিতে অংশগ্রহণকারীদের হাতে থাকা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে আদিবাসীদের অধিকার, ভূমি, ভাষা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়।
এ সময় আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে তাদের নিজস্ব ভাষায় বিভিন্ন গান পরিবেশন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দাবির পক্ষে স্লোগান দেন অংশগ্রহণকারীরা। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ছিল— “আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মাননা: জীবন ও সুস্থতা সুরক্ষায় তাঁদের অবদান”। র্যালি শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কর্নেলিয়াস মুরমু। এ সময় বক্তব্য দেন সমাজ উন্নয়ন কর্মী নিকোলাস মুরমু, কোল আদিবাসী নেত্রী কল্পনা মুরমু, উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা মনিকা সরেন, শিক্ষক আলবেরিকুশ মুরমু এবং আদিবাসী যুব নেতা সিপানুয়েল হেমব্রম।
সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন কমিটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সভাপতি ডাবলু কুমার ঘোষ এবং রেডিও মহানন্দার সহকারী স্টেশন ম্যানেজার মো. রেজাউল করিম টুটুল। সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের তথ্য, যোগাযোগ ও প্রচার সম্পাদক প্রদীপ হেমব্রম।
সমাবেশে সরকারের কাছে যে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়, সেগুলো হলো—
১. সংবিধানে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন ও মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।
৩. আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি দখল বন্ধ করে কার্যকর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. আদিবাসীদের সংস্কৃতি সংরক্ষণে রাজধানীসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৫. সাঁওতালসহ সকল আদিবাসী শিশুর জন্য প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত চালু করতে হবে।
৬. জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে আদিবাসীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
৭. আলফ্রেড সরেন, চুডু সরেন, বাগদা ফার্মের তিন সাঁওতাল নেতা শ্যামল হেমরম, মঙ্গল মার্ডী ও রমেশ টুডু, চলেশ রিছিল, পীরেন স্নালসহ সমতল ও পাহাড়ে সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে এবং আদিবাসীদের ভূমি প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, আদিবাসীদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। বিশেষ করে সমতলের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার সুরক্ষা, মাতৃভাষায় শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় সরকারের সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তারা বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আদিবাসীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভূমি বিরোধের সমাধান, আদিবাসীদের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।