রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত ভয়াবহ জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্ণ হলেও বহুল আলোচিত এই মামলার বিচার এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের শুনানি শুরু হয়নি। ফলে দেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার বিচার কবে শেষ হবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, সর্বোচ্চ আদালতে মামলার দীর্ঘ জট, বিচারপতির সীমিত সংখ্যা এবং আসামিপক্ষের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে মামলাটির নিষ্পত্তি হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশান-২ এলাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি ও গ্রেনেড নিয়ে হামলা চালায় পাঁচ জঙ্গি। প্রায় ১২ ঘণ্টার জিম্মি সংকটের মধ্যে তারা ২০ জন বিদেশি ও বাংলাদেশি নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয় এবং তিনজন বাংলাদেশি। জিম্মি উদ্ধারের প্রস্তুতিকালে জঙ্গিদের নিক্ষেপ করা বিস্ফোরকে নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান।
পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে। অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয় এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। এই হামলা দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। ঘটনার দুই বছরের বেশি সময় তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের সন্ত্রাস দমন ইউনিট। তদন্তে উঠে আসে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’ প্রায় ছয় মাস পরিকল্পনা করে এই হামলা চালিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।
২০১৯ সালের নভেম্বরে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে উচ্চ আদালত সেই রায় পরিবর্তন করে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গি ঘটনাস্থলেই নিহত হওয়ায় জীবিত সাত আসামির বিরুদ্ধে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, অস্ত্র সংগ্রহ, সদস্য নিয়োগ ও হামলায় প্ররোচনার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ডই উপযুক্ত শাস্তি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ২০২৫ সালের মে মাসে ছয় দণ্ডিত আসামি খালাস চেয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন। কিন্তু এখনো শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়নি। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, হোলি আর্টিজান মামলার গুরুত্ব শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সর্বোচ্চ আদালতে বিপুল মামলাজট থাকায় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মামলার নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, বর্তমানে সর্বোচ্চ আদালতে কয়েক বছর আগের ফৌজদারি আপিলগুলোর শুনানি চলছে। সেই ধারাবাহিকতায় এই মামলার শুনানি শুরু হতেও আরও সময় লাগতে পারে। তাদের অভিযোগ, অনেক দণ্ডিত আসামির আর্থিক অসচ্ছলতার কারণেও আপিল কার্যক্রম দ্রুত এগোচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ঘটনার পর জঙ্গিবিরোধী অভিযানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এলেও বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষা এখনো শেষ হয়নি। এক দশক পরও এই মামলার চূড়ান্ত রায় না হওয়া বিচারব্যবস্থার গতি ও দক্ষতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।