ধেয়ে আসছে সুপার এল নিনো ১৯৯৭ সালের পর এবার আরও তীব্র আকারে বেড়ে যেতে পারে বৈশ্বিক উষ্ণতা। কারণ,ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে গেছে ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাব। যা গরমের তীব্রতা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগকে তীব্র করতে পারে। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘এল নিনো’ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী এটি আরও তীব্র হয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বা ‘সুপার’ এল নিনোতে পরিণত হবে। অনেক যার নাম দিয়েছেন ‘গডজিলা এল নিনো’। ধারণা করা হচ্ছে, এবারেরটি ১৯৯৭ সালের রেকর্ড গড়া ‘এল নিনো’র চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে। সেসময় তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল বিশ্বজুড়ে। সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর শরতকাল পর্যন্ত ‘এল নিনো’ অব্যাহত থাকবে এবং তা শীতকাল পর্যন্ত থাকার উচ্চ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এবারের ‘এল নিনো’র’ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ। এমনটি ঘটলে এটি ১৯৫০ সালের চেয়ে বড় ‘এল নিনো’র মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ববাসী। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বায়ুমন্ডলে যে উষ্ণতা বাড়ে বিজ্ঞানীরা তাকেই ‘এল নিনো’ নামে অভিহিত করেন। ক্লার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যাবি ফ্রেজিয়ার ব্যাখ্যা করেন, ‘এল নিনো’র কারণে উষ্ণ ও গভীর সমুদ্রের পানি ভূপৃষ্ঠে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তাপ নিয়ে আসে। এর ফলে বিশ্বের বহু অঞ্চলে নানা ধরনের চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। এনওএএ-এর জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র এই ‘এল নিনো’র অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার ৬৩ শতাংশ সম্ভাবনা দেখছেন, যা ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক রেকর্ডের অন্যতম বৃহত্তম এল ‘নিনো ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে ২ ডিগ্রি বেশি দাঁড়িয়েছে এবং কিছু নির্ভরযোগ্য গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ইঙ্গিত পাচ্ছেন যে, এই সীমাও ব্যাপকভাবে অতিক্রম করতে পারে। গত কয়েক মাস ধরে, পরিবর্তনশীল বায়ুর প্রভাবে বিপুল পরিমাণ অস্বাভাবিক গরম জল পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে পূর্ব ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ধেয়ে আসছে। এই অস্বাভাবিক গরম জল সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৬০০ থেকে ১,০০০ ফুট গভীর। হাজার হাজার মাইল পূর্বে, দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠতে শুরু করেছে এই গরম জল। অতীতের তীব্র এল নিনোগুলোর সময়েও একই ধরনের গতিপ্রকৃতি দেখা গেছে। সুপার এল নিনো’ ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল, যার সাম্প্রতিকতমগুলোর মধ্যে ঘটেছিল ২০১৫-১৬, ১৯৯৭-৯৮ এবং ১৯৮২-৮৩ সালে। এনওএএ জানাচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণ থেকে মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের পাশাপাশি এটি বৈশ্বিক গড় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। যা কার্যত নিশ্চিত করে যে ২০২৭ সাল ২০২৪ সালকে ছাড়িয়ে গিয়ে পৃথিবী নতুন উষ্ণতম বছরের রেকর্ড স্থাপন করবে।
এল নিনো’র নেতিবাচক প্রভাব : এল নিনো’ স্থানভেদে তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং খরাসহ কিছু নির্দিষ্ট চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শীতকালে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়।
হারিকেন: যদিও ‘এল নিনো’ মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় মৌসুম বায়ুকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে, তবে এতে আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেনের সংখ্যা সীমিত রাখার প্রবণতা দেখায়। হারিকেন মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং হাওয়াইয়ের জন্য বড় আশঙ্কা তৈরি করতে পারে, যা নির্ভর করবে ঝড়গুলো কোন পথে অগ্রসর হচ্ছে তার উপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীতকাল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উত্তরাঞ্চল থেকে পশ্চিম কানাডা এবং আলাস্কা পর্যন্ত সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ আবহাওয়া দেখা যায়, যদিও এর মানে এই নয় যে, মাঝে মাঝে ঠান্ডা আবহাওয়া থাকবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল প্রায়শই বেশি আর্দ্র এবং শীতল থাকে, কারণ একটি অধিক সক্রিয় জেট স্ট্রিম এই অঞ্চলের উপর দিয়ে আরও বেশি ঝড় বয়ে নিয়ে আসে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিনের খরায় ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্য এর কিছু সুবিধা পেতে পারে। তবে আমেরিকা কিংবা প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলগুলোর জন্য ঝুঁকি বাড়ছে। পশ্চিম দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে, যেখানে কয়েক দশক আগে প্রথম ‘এল নিনো’র প্রভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল, সেখানে অতিভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকাল আরও উষ্ণ হতে পারে। এছাড়া ভারতে আরও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে খরা, দাবানল ও অতিরিক্ত তাপ অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং ‘এল নিনো’ বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আজহার এহসান বলেন, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। সেখানে তীব্র খরার পর বিপজ্জনক মাত্রার ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন বলেন, 'ভয় পাওয়ার পরিবর্তে আমরা মানুষকে প্রস্তুত থাকতে বলতে পারি।