স্ট্রোক একটি গুরুতর চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যা মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণের কারণে ঘটে। মস্তিষ্কের কোষ স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্তের ওপর নির্ভরশীল। রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হলে মস্তিষ্কের কোষ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ফলে রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে স্ট্রোকের কারণে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্ব স্ট্রোক দিবস আজ। স্ট্রোক সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমটি ইস্কেমিক স্ট্রোক, যা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী কোনো রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধা বা বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণে ঘটে। দ্বিতীয়টি হেমোরেজিক স্ট্রোক, যা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণের ফলে হয়। দুই ধরনের স্ট্রোকেরই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। তবে স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়।
স্ট্রোকের লক্ষণ
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লক্ষণগুলো দ্রুত চিনতে পারা। সাধারণত হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশের হাত বা পা দুর্বল হয়ে পড়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া স্ট্রোকের উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। এছাড়া কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া, হঠাৎ এক বা দুই চোখে দেখতে সমস্যা, হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারানো, মাথা ঘোরা এবং অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও স্ট্রোকের সংকেত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, এসব লক্ষণের যেকোনো একটি হঠাৎ দেখা দিলেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। রোগীর অবস্থা নিজে থেকে ভালো হওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়। একইভাবে লক্ষণগুলোকে সাধারণ দুর্বলতা, ক্লান্তি বা সাময়িক অসুস্থতা ভেবে অবহেলা করাও বিপজ্জনক হতে পারে। স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। বাংলাদেশে জরুরি সহায়তার জন্য জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
রোগীকে কখন থেকে অসুস্থ মনে হচ্ছে, কিংবা সর্বশেষ কখন স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেছে, সেই সময়টি মনে রাখা জরুরি। চিকিৎসকেরা এই তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এ সময় রোগীকে নিজের ইচ্ছামতো কোনো ওষুধ খাওয়ানো উচিত নয়। বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং চিকিৎসকদের নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে এবং রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এছাড়া ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, হৃদরোগ, ধূমপান, স্থূলতা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে শরীরে এসব ঝুঁকির কারণ থাকলেও স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ রয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
স্ট্রোক প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পাশাপাশি ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পরিহার, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখা এবং অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য রোগের কথা বিবেচনায় রেখে নিয়মিত হাঁটা বা উপযুক্ত ব্যায়াম করা যেতে পারে। যারা আগে থেকেই কোনো রোগের জন্য ওষুধ সেবন করছেন, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
স্ট্রোকের মতো লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে সেরে গেলেও সেটিকে অবহেলা করা যাবে না। এটি সাময়িকভাবে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার লক্ষণ হতে পারে, যাকে ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (টিআইএ) বলা হয়। এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে। তাই লক্ষণ চলে গেলেও জরুরি চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বিশ্ব স্ট্রোক দিবসের মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করা। শুধু রোগী নয়, পরিবারের সদস্য, সহকর্মী ও আশপাশের মানুষেরও স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ শনাক্ত করতে দেরি করা, বাড়িতে বসে চিকিৎসার চেষ্টা করা কিংবা রোগীকে সুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে বলা বিপদের কারণ হতে পারে। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো এবং উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানো সম্ভব।