শরীর সুস্থ রাখতে শুধু পেট ভরে খাওয়াই যথেষ্ট নয়, খাবার হজম হওয়া এবং পুষ্টি শোষিত হওয়াও জরুরি। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে অন্ত্রে থাকা অসংখ্য অণুজীব। উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে এবং হজমের কাজে সহায়তা করে। অন্ত্রের যত্নে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় দইয়ের মতো ফার্মেন্টেড খাবার রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি ঘরেই তৈরি করে নিতে পারেন কয়েক ধরনের পরিচিত পানীয়। এগুলো খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি অন্ত্রের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতেও সহায়ক হতে পারে।
১. টক দইয়ের লাচ্ছি
দই দিয়ে তৈরি লাচ্ছি সহজ, সুস্বাদু এবং গরমের দিনে বেশ আরামদায়ক পানীয়। দইয়ে জীবিত উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে।
উপকরণ
টক দই ১ কাপ
ঠান্ডা পানি আধা কাপ
ভাজা জিরার গুঁড়া আধা চা-চামচ
সামান্য লবণ
-কয়েকটি পুদিনাপাতা (ঐচ্ছিক)
প্রস্তুত প্রণালি: দই, পানি, জিরার গুঁড়া ও লবণ একসঙ্গে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। মিশ্রণটি মসৃণ হলে গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করুন। অতিরিক্ত চিনি না দিলেও এটি সুস্বাদু হবে। চাইলে স্বাদের জন্য সামান্য পুদিনাপাতা যোগ করতে পারেন।
২. বিটরুটের ফার্মেন্টেড পানীয়
বিটরুট দিয়ে তৈরি টক স্বাদের পানীয় বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত। এতে বিটের স্বাভাবিক রং ও স্বাদ পাওয়া যায়। তবে নিরাপদভাবে ফার্মেন্টেশন করা জরুরি।
উপকরণ
মাঝারি আকারের বিটরুট ১টি
পরিশোধিত পানি ৩ কাপ
সরিষার গুঁড়া ১ চা-চামচ (ঐচ্ছিক)
লবণ পরিমাণমতো
প্রস্তুত প্রণালি: বিটরুট ভালোভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে ছোট টুকরো করুন। পরিষ্কার কাচের পাত্রে বিটরুট, সরিষার গুঁড়া, লবণ ও পানি মিশিয়ে নিন। নিরাপদ ফার্মেন্টেশন পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রস্তুত করুন এবং তৈরি হলে ফ্রিজে রাখুন। অস্বাভাবিক গন্ধ, ছত্রাক বা পিচ্ছিল ভাব দেখা দিলে পান করবেন না।
৩. পান্তা ভাত
পান্তা ভাত বাঙালির পরিচিত খাবার। গরম ভাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরদিন সকালে খাওয়ার প্রচলন দীর্ঘদিনের। তবে ভাত দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় রাখলে Bacillus cereus-এর মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। তাই পান্তা তৈরির ক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
উপকরণ
রান্না করা ভাত ১ কাপ
নিরাপদ পানীয় পানি প্রয়োজনমতো
সামান্য লবণ
প্রস্তুত প্রণালি: রান্না করা ভাত দ্রুত ঠান্ডা করে পরিষ্কার, ঢাকনাযুক্ত পাত্রে ফ্রিজে রাখুন। পান্তা তৈরির সময় নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন এবং ভাত ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখবেন না। শুধু ভাত পানিতে ভিজিয়ে রাখলেই নিরাপদ বা উপকারী প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
৪. লবণ-পানিতে মজানো আমলকি
আমলকিতে ভিটামিন সি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। লবণ-পানিতে মজিয়ে রাখলে এর স্বাদে পরিবর্তন আসে। সঠিকভাবে ফার্মেন্ট করা হলে এটি খাবারে বৈচিত্র্য আনতে পারে।
উপকরণ
আমলকি ২৫০ গ্রাম
নিরাপদ পানি প্রয়োজনমতো
লবণ ৫ গ্রাম
সামান্য সরিষার গুঁড়া (ঐচ্ছিক)
প্রস্তুত প্রণালি: আমলকি ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। পরিষ্কার কাচের বয়ামে আমলকি, লবণ ও পানি দিন, যাতে ফলগুলো পানির নিচে থাকে। চাইলে সামান্য সরিষার গুঁড়া যোগ করতে পারেন। নিরাপদ ফার্মেন্টেশনের নিয়ম অনুসরণ করুন এবং তৈরি হলে ফ্রিজে রাখুন। অস্বাভাবিক ছত্রাক বা দুর্গন্ধ দেখা দিলে ফেলে দিন।
৫. আদার ফার্মেন্টেড পানীয়
আদা দিয়ে তৈরি ফার্মেন্টেড পানীয়ের স্বাদ ঝাঁঝালো ও হালকা টক হতে পারে। তবে আদা, চিনি ও পানি একসঙ্গে কয়েক দিন রেখে দিলেই নিরাপদ প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ পানীয় তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
উপকরণ
আদা কুচি
চিনি
নিরাপদ পানি
প্রস্তুত প্রণালি: এ ধরনের পানীয় তৈরিতে নির্ভরযোগ্য ফার্মেন্টেশন পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করুন এবং উপযুক্ত তাপমাত্রা ও সংরক্ষণবিধি মেনে চলুন। অনিয়ন্ত্রিতভাবে কয়েক দিন ঘরের তাপমাত্রায় রেখে তৈরি পানীয় পান করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অস্বাভাবিক গন্ধ, ছত্রাক বা অন্য কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে পান করবেন না।
অন্ত্র সুস্থ রাখতে আরও যা করবেন
অন্ত্রের যত্নে শুধু ফার্মেন্টেড পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। খাদ্যতালিকায় রাখুন—
আঁশসমৃদ্ধ খাবার: শাকসবজি, ফল, ডাল ও পূর্ণ শস্য।
দই: সহ্য হলে চিনি ছাড়া টক দই খেতে পারেন।
পর্যাপ্ত পানি: শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পানি পান করুন।
বৈচিত্র্যময় খাবার: বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার অন্ত্রের অণুজীবের জন্য উপকারী হতে পারে।
মনে রাখবেন, সব ফার্মেন্টেড খাবারেই জীবিত উপকারী ব্যাকটেরিয়া সমান পরিমাণে থাকে না। তাই স্বাদ ও বৈচিত্র্যের পাশাপাশি খাবারের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিন।