শনিবার ১৬ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২রা জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৯ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি
LIVE
শিরোনাম
Printed on: May 16, 2026
May 16, 2026
আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

চীন সফরে কী পেলেন ট্রাম্প জিনপিংয়ের লাভ কতটা

Published: May 16, 2026 at 09:29 AM
চীন সফরে কী পেলেন ট্রাম্প জিনপিংয়ের লাভ কতটা

দীর্ঘ টানাপড়েন, শুল্কযুদ্ধ ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পর অবশেষে মুখোমুখি হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২০১৭ সালের পর চীনে এটি ছিল ট্রাম্পের প্রথম সফর। এই সময়ে দুই নেতা সম্পর্ক স্থিতিশীল করার অঙ্গীকার করেছেন, নতুন বাণিজ্য সমঝোতার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তবে সফরের চাকচিক্য ও হাসিমুখের আড়ালে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে আসলে কে বেশি লাভবান হলেন? দুই পক্ষের দেওয়া ভিন্ন ভিন্ন বিবৃতির আড়ালে উঁকি দিচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো কিংবা তাইওয়ান, ইরান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো গভীর মতভেদপূর্ণ ইস্যুগুলোতে আদতে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দুই নেতার বিপরীতমুখী বক্তব্যই বলে দিচ্ছে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা আলাদা।


গোপন বাগান থেকে স্বর্গ মন্দির

গত ১৫ মার্চ বেইজিংয়ের ‘ফরবিডেন সিটি’ বা নিষিদ্ধ নগরীর পাশেই অত্যন্ত সুরক্ষিত ঝংনানহাই বাগানে চা-চক্র এবং ওয়ার্কিং লাঞ্চের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প তার চীন সফর শেষ করেন। এর আগের দিন দুই নেতা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বৈঠক করেন এবং রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নেন। সফরের একপর্যায়ে তারা ৬০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘টেম্পল অব হেভেন’ বা ‘স্বর্গ মন্দির’ পরিদর্শনে যান যেখানে একসময় চীনা সম্রাটরা ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করতেন। ট্রাম্পের এই সফরে তার ছেলে এরিক ট্রাম্প ছাড়াও মার্কিন ব্যবসায়ী ইলন মাস্ক (টেসলা) এবং জেনসেন হুয়াংসহ (এনভিডিয়া) এক ডজনেরও বেশি শীর্ষ করপোরেট ব্যক্তিত্ব অংশ নেন।


ট্রাম্প-শির ‘বন্ধুত্ব’

বৈঠক শেষে দুই নেতাই সফরটিকে অত্যন্ত সফল বলে দাবি করেছেন। ঝংনানহাইয়ের বাগানে হাঁটার পর শি জিনপিং বলেন, ‘দুই পক্ষই স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং একে অপরের উদ্বেগকে সঠিকভাবে মূল্যায়নের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।’ মজার বিষয় হলো, শি জিনপিং এ সময় ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা)-কে নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য ‘চীনা জাতির মহান পুনরুত্থান’-এর সঙ্গে তুলনা করেন অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্টকে নিজের ‘বন্ধু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি চীনের আতিথেয়তায় ‘অত্যন্ত মুগ্ধ’। বেশ কিছু ‘চমৎকার বাণিজ্য চুক্তি’ সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বা তার কাছাকাছি সময়ে শি জিনপিংকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানান। পরে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই নিশ্চিত করেন, আগামী শরৎকালেই শি যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন।


বাণিজ্য সংঘাতে ধোঁয়াশা কাটেনি

ঝকঝকে এই কূটনৈতিক সৌজন্যের আড়ালে আসল প্রশ্নটি কিন্তু আটকেই রইল। গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় দুই নেতার সাক্ষাতের সময় বাণিজ্য সংঘাত বন্ধে এক বছরের জন্য যে চুক্তি হয়েছিল, সেটার মেয়াদ আদতে বাড়ল কি না ট্রাম্প বেইজিং ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা পরও তা স্পষ্ট ছিল না। উল্লেখ্য, গত বছর ট্রাম্প কিছু চীনা পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। চীনও পাল্টা জবাব দেয় এবং বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে মে মাসের ১৩ তারিখে সিউলে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং চীনের ভাইস-প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ে মধ্যে এক প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে কিছু অগ্রগতির আভাস পাওয়া গিয়েছিল। বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, কম সংবেদনশীল চীনা পণ্যের শুল্ক কমাতে একটি ‘বোর্ড অব ট্রেড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রে চীনা বিনিয়োগ সহজ করতে একটি ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ গঠনের আলোচনা চলছে। অ-রাষ্ট্রীয় কোনো পক্ষ যেন শক্তিশালী এআই মডেলের নিয়ন্ত্রণ না পায়, সে বিষয়েও একটি প্রোটোকল তৈরির কথা জানান তিনি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-ও বৈঠক শেষে একটি ‘ট্রেড কাউন্সিল’ ও ‘ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের ঘোষণা দেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, মূল বিষয়গুলো এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এদিকে বেইজিং ছাড়ার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি শির সঙ্গে শুল্ক নিয়ে কোনো কথাই বলেননি!


ট্রাম্পের ঝুলিতে বোয়িং ও কৃষিপণ্য

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী বেশ কিছু চুক্তি সম্পন্ন হলেও চীন এখনো তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। এর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রাম্পের ঘোষণা করা চীনের কাছে ২০০ বোয়িং প্লেন বিক্রির চুক্তি। যদিও প্রত্যাশা ছিল ৫০০ প্লেনের, তবুও ২০১৭ সালের পর চীনের সঙ্গে বোয়িংয়ের এটিই সবচেয়ে বড় চুক্তি।


এছাড়াও মার্কিন কর্মকর্তাদের আশা, চীন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য (বিশেষ করে গরুর মাংস ও সয়াবিন) কিনতে রাজি হবে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টির মূল ভোটার দল মার্কিন কৃষকদের সন্তুষ্ট করতে ট্রাম্পের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।মধ্যপ্রাচ্য এবং ইরান ইস্যুতেও ট্রাম্প দাবি করেছেন, দুই নেতার মানসিকতা একই রকম। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ বন্ধ করতে চাই, ইরান যেন পরমাণু অস্ত্র না পায় এবং হরমুজ প্রণালি যেন উন্মুক্ত থাকে।’ তবে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই কেবল সংলাপ ও শান্তির ওপর জোর দিয়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।


শির নজর তাইওয়ানে

চীনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে তাইওয়ান ইস্যুতে। শি জিনপিং ট্রাম্পকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, এই ইস্যুটি সঠিকভাবে সামলানো না হলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি কমাতে রাজি করানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের মুখে বলানো যে তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতার ‘বিরোধিতা’ করে।


বৈঠক শেষে ট্রাম্প জানান, তিনি অস্ত্র বিক্রি নিয়ে শির সঙ্গে ‘বিস্তারিত’ আলোচনা করেছেন। তবে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদিত ১৩ বিলিয়ন ডলারের নতুন অস্ত্র চুক্তি তিনি বাতিল করবেন কি না, তা খোলসা করেননি। ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি খুব ভালো নেগোশিয়েটিং চিপ (আলোচনার অস্ত্র)।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি কারও স্বাধীনতা খুঁজতে ৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করতে রাজি নই।’ চীন যদি তাইওয়ান আক্রমণ করে তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি প্রতিরোধে আসবে কি না—শির এমন প্রশ্নের জবাব ট্রাম্প এড়িয়ে যান, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। শি জিনপিং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে একটি নতুন শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’। এর মাধ্যমে তিনি ওয়াশিংটনের চীন-বিরোধী কট্টরপন্থিদের কোণঠাসা করে এমন এক সম্পর্কে ট্রাম্পকে বাঁধতে চান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান বা অন্য কোনো ইস্যুতে চীনকে উসকানি দেবে না। তবে মার্কিন বিবৃতিতে এই চুক্তির কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। বৈঠকের প্রথম দিনেই শি জিনপিং ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন, বিশ্ব এখন ‘শত বছরের মধ্যে দেখা যায়নি এমন এক পরিবর্তনের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা মূলত মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার ভাঙনকেই নির্দেশ করে। তিনি উদীয়মান শক্তির সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত শক্তির অবশ্যম্ভাবী সংঘাতের তত্ত্ব ‘থুসিডাইডিসের ফাঁদ’-এরও উল্লেখ করেন। পরে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘শি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্র হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন, তবে তিনি আসলে জো বাইডেনের আমলের যুক্তরাষ্ট্রের কথা বুঝিয়েছেন। বেইজিংয়ের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন আর হাসিমুখের করমর্দন শেষে দুই নেতাই হয়তো নিজ নিজ দেশের জনগণের জন্য সফলতার গল্প নিয়ে ফিরেছেন। তবে পর্দার পেছনের আসল চিত্রটি হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিং, দুজনেই সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি চিত্রনাট্য নিয়ে এগোচ্ছেন, যার মিল হওয়া সহজ নয়।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট