সোমবার ১৫ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১লা আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৯ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি
LIVE
Printed on: June 15, 2026
June 15, 2026
বিনোদন
বিনোদন

এখনো হাজারো মানুষের স্বপ্নের রানী অভিনেত্রী শাবানা

Published: June 15, 2026 at 12:18 PM
এখনো হাজারো মানুষের স্বপ্নের রানী অভিনেত্রী শাবানা

মাত্র ৯ বছর বয়সেই থেমে যায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি যাত্রা, যা পরে তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে।

আফরোজা সুলতানা রত্না নামের সেই ছোট্ট মেয়েটিই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন কোটি দর্শকের প্রিয় অভিনেত্রী শাবানা। অসাধারণ অভিনয়-দক্ষতা, পর্দায় অনবদ্য উপস্থিতি এবং অনন্য সৌন্দর্যের কারণে তিনি পেয়েছেন ‘ঢালিউডের বিউটিকুইন’ খ্যাতি।

১৯৫২ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাবানা। তার বাবা ফয়েজ চৌধুরী এবং মা ফজিলাতুন্নেসা।


১৯৬২ সালে পরিচালক আজিজুর রহমানের হাত ধরে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয় তার। প্রথম অভিনয় করেন এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবিতে। পরে নৃত্যশিল্পী হিসেবেও কাজ করেন তিনি।

সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য, জনপ্রিয় চলচিত্র নায়িকা শাবানা - আমাদের খবর

অভিনয়ে যাত্রা শুরুর মাত্র পাঁচ বছর পরই নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন রত্না।

১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘চকোরী’ চলচ্চিত্রে পাকিস্তানি অভিনেতা নাদিমের বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি। এই ছবির মাধ্যমেই পরিচালক তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘শাবানা’, আর সেই নামেই তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে যান।

বাংলা চলচ্চিত্রে শাবানাকে ঘিরে একটি বহুল প্রচলিত কথা রয়েছে ‘সেলাই মেশিন মানেই শাবানা’। কারণ, পর্দায় তিনি অসহায়, সংগ্রামী বধূ কিংবা মায়ের চরিত্রে এমন বাস্তবসম্মত অভিনয় করেছেন যে দর্শকের মনে তা স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। বহু ছবিতে দেখা গেছে, স্বামী পরিত্যক্ত এক নারীর চরিত্রে সন্তানকে মানুষ করতে তিনি সেলাইয়ের কাজ করছেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাতেও সফল পদচারণা ছিল তার। ১৯৭৯ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এস এস প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত ‘মাটির ঘর’ ছিল তার প্রথম প্রযোজিত চলচ্চিত্র। আজিজুর রহমান পরিচালিত এ ছবিতে রাজ্জাক ও শাবানার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং ছবিটি ব্যাবসায়িকভাবেও সাফল্য পায়।

১৯৮৮ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র ‘বিরোধ’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় আসেন তিনি। এ ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজেশ খান্না। পরে ছবিটি হিন্দিতে ‘শত্রু’ নামে ডাবিং করে মুক্তি দেওয়া হয়।

শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কিংবদন্তিদের সঙ্গেও সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল তার। ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত এবং বিশ্বখ্যাত হলিউড অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ন বাংলাদেশ সফরে এসে এফডিসি পরিদর্শন করেন। সে সময় শাবানাসহ দেশের বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৪ সালে সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী ওয়াহিদ সাদিককে বিয়ে করেন শাবানা। পরবর্তী সময়ে তারা যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন এস এস প্রোডাকশন্স। তাদের সংসারে দুই মেয়ে—সুমি ও ঊর্মি এবং এক ছেলে নাহিন রয়েছেন।

পুরস্কারের দিক থেকেও শাবানা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অনন্য। ১৯৭৭ সালে ‘জননী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে পার্শ্বচরিত্র বিভাগে মনোনীত হলেও তিনি সেই পুরস্কার গ্রহণ করেননি। পরে ১৯৮০ সালে ‘সখী তুমি কার’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রথমবার সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

এরপর অভিনয়জীবনে তিনি মোট ১১ বার সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন, যা এখনো কোনো বাংলাদেশি অভিনেত্রীর জন্য সর্বোচ্চ অর্জন। তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।

১৯৯৯ সালে অভিনয় থেকে সরে দাঁড়িয়ে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন শাবানা। যদিও তার শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ মুক্তি পায় ২০০১ সালে। আজিজুর রহমান পরিচালিত এ ছবিটি ছিল শাবানা-আলমগীর জুটির শেষ সিনেমা। বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয়ের রেকর্ডও তাদের দখলে। শাবানা অভিনয় করেছেন মোট ২৯৯টি চলচ্চিত্রে, যার মধ্যে ১৩০টিতেই তার সহশিল্পী ছিলেন আলমগীর।

সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। এরপর আর দেশে আসা হয়নি তার। পর্দা থেকে দূরে থাকলেও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এবং দর্শকের হৃদয়ে শাবানা আজও এক অমলিন কিংবদন্তি।