একসময় ইংল্যান্ডজুড়ে দেখা যেত ওসপ্রে বা মাছ শিকারি ঈগল। কিন্তু ১৮ ও ১৯ শতকে অতিরিক্ত শিকার ও আবাসস্থল কমে যাওয়ায় ১৮৪৭ সালে ইংল্যান্ডে প্রজননকারী পাখি হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এটি। এরপর কেটে যায় ১৫০ বছরেরও বেশি সময়। স্কটল্যান্ডে অবশ্য ওসপ্রের একটি দল টিকে ছিল। সংরক্ষণকাজের ফলে সেখানে ধীরে ধীরে পাখিটির সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু নিজেরাই স্কটল্যান্ড থেকে ইংল্যান্ডের দিকে ছড়িয়ে পড়তে তাদের আরও অনেক সময় লাগতে পারত। তাই পাখিটিকে ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেন সংরক্ষণকর্মীরা। ১৯৯৬ সালে শুরু হয় সেই উদ্যোগ। লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের রাটল্যান্ড ওয়াটার এলাকায় ওসপ্রের এমন একটি দল তৈরি করা, যারা পরে নিজেরাই বংশবিস্তার করতে পারবে। রাটল্যান্ডকে বেছে নেওয়ারও কারণ ছিল। ব্রিটেন থেকে পশ্চিম আফ্রিকায় যাওয়ার পথে ওসপ্রে পাখি দীর্ঘদিন ধরে রাটল্যান্ড ওয়াটারে থামত। ১৯৭৬ সালে তৈরি এই জলাধারে প্রচুর মাছ থাকায় সেখানে ওসপ্রের বংশবিস্তার করার ভালো সুযোগ ছিল।
১৯৯৬ সালে রাটল্যান্ড ওসপ্রে প্রকল্পের মাধ্যমে স্কটল্যান্ডের বাসা থেকে ওসপ্রের ছানা এনে রাটল্যান্ড ওয়াটারে রাখা শুরু হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মোট ৬৫টি ছানা স্কটল্যান্ড থেকে সেখানে আনা হয়। পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ বয়সী এসব ছানাকে স্কটল্যান্ড থেকে দক্ষিণে নিয়ে এসে জলাধারের পাশে বিশেষভাবে তৈরি খাঁচায় রাখা হতো। কিছুদিন পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হতো। এরপর তারা নিজেরাই আফ্রিকার দিকে পরিযানে চলে যেত। এই পরিকল্পনার পেছনে ছিল ওসপ্রের একটি বিশেষ স্বভাব। সাধারণত প্রজননের বয়স হলে ওসপ্রে যে এলাকায় বড় হয়, সেখানেই ফিরে আসে।
১৯৯৯ সালে স্কটল্যান্ড থেকে আনা প্রথম একটি পুরুষ ওসপ্রে রাটল্যান্ডে ফিরে আসে। এরপর ২০০১ সালে আসে বড় সাফল্য। ১৫০ বছর পর জন্ম নিল ইংল্যান্ডে ওসপ্রে, ২০০১ সালে ০৩(৯৭) নামে পরিচিত সেই পুরুষ ওসপ্রে একটি স্ত্রী পাখির সঙ্গে জুটি বাঁধে। পরে তারা রাটল্যান্ড ওয়াটারের কাছে একটি ছানা জন্ম দেয়। ইংল্যান্ডের মধ্যাঞ্চলে ১৫০ বছরেরও বেশি সময় পর সেটিই ছিল প্রথম ওসপ্রে ছানা। পাখিটির নাম পরে দেওয়া হয় ‘মিস্টার রাটল্যান্ড’। সংরক্ষণ প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাখিগুলোর একটি হয়ে ওঠে সে।
মিস্টার রাটল্যান্ড ২০১৪ সাল পর্যন্ত বংশবিস্তার করে। তিনটি ভিন্ন স্ত্রী পাখির সঙ্গে তার ৩২টি ছানা জন্ম নেয়। তার কয়েকটি সন্তানও পরে রাটল্যান্ডে ফিরে এসে বংশবিস্তার শুরু করে। এভাবেই ধীরে ধীরে সেখানে ওসপ্রের এমন একটি দল তৈরি হয়, যাদের টিকিয়ে রাখতে আর স্কটল্যান্ড থেকে নতুন ছানা আনার প্রয়োজন হয়নি। ২০০৭ সালে রাটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া প্রথম একটি ওসপ্রে নিজেই বংশবিস্তার শুরু করে। এটিও ছিল প্রকল্পটির জন্য বড় সাফল্য।
৩০০ ছানা পেরিয়ে এখন স্বনির্ভর জনসংখ্যা, এরপর রাটল্যান্ডে ওসপ্রের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। ২০২৫ সালে প্রকল্পটি ৩০০তম ছানা সফলভাবে উড়তে শেখার মাইলফলক উদ্যাপন করে। ওই বছর রাটল্যান্ড এলাকায় ১১টি ওসপ্রে জোড়া থেকে ৩১টি ছানা উড়তে শেখে। তখন পর্যন্ত এক বছরে এটিই ছিল সর্বোচ্চ সংখ্যা। তবে প্রকল্পটির সাফল্য শুধু রাটল্যান্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ওসপ্রে ব্রিটেনের অন্য এলাকাতেও গিয়ে বংশবিস্তার করেছে। ওয়েলস ও ডরসেটেও এসব পাখির বংশধর দেখা গেছে। বিদেশের কিছু ওসপ্রে জনসংখ্যা তৈরিতেও রাটল্যান্ডের পাখিদের ভূমিকা রয়েছে।
এই সাফল্য ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও একই ধরনের পুনঃপ্রবর্তন প্রকল্প নিতে উৎসাহ দিয়েছে। লেস্টারশায়ার অ্যান্ড রাটল্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাটল্যান্ডের ওসপ্রে জনসংখ্যা স্বনির্ভর। অর্থাৎ এই জনসংখ্যা টিকিয়ে রাখতে স্কটল্যান্ড থেকে আর নতুন ছানা এনে ছাড়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। ১৯৯৬ সালে যখন প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল, তখন লক্ষ্য ছিল বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি পাখিকে ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে আনা। ৩০ বছর পর সেই উদ্যোগ এখন নিজেই একটি সফল গল্প। একসময় স্কটল্যান্ড থেকে ছানা এনে রাটল্যান্ডে ছাড়তে হয়েছিল। এখন তাদের বংশধরেরাই সেখানে ফিরে আসে, জুটি বাঁধে এবং নতুন প্রজন্ম তৈরি করে। প্রকৃতিতে হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত তখনই আসে, যখন মানুষের সহায়তায় শুরু করা উদ্যোগ একসময় আর মানুষের ওপর নির্ভরশীল থাকে না। রাটল্যান্ডের ওসপ্রের গল্পে সেটিই ঘটেছে।