সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৮ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: September 21, 2026
September 21, 2026
লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

রাতে কী খাচ্ছেন, তার ওপর কি নির্ভর করছে ঘুম?

Published: September 21, 2026 at 11:18 AM
রাতে কী খাচ্ছেন, তার ওপর কি নির্ভর করছে ঘুম?

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কী খাচ্ছেন এবং কখন খাচ্ছেন; দুটিই ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, ক্লান্ত থাকলে ক্ষুধা বাড়ে, আবার ক্ষুধার কারণেও অস্বস্তি হতে পারে। খাবার ও ঘুমের মধ্যে সম্পর্কটা অবশ্য এর চেয়েও গভীর। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কী খাচ্ছেন এবং কখন খাচ্ছেন; দুটিই ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আবার পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরদিন খাবারের প্রতি আমাদের আগ্রহ ও খাওয়ার পরিমাণও বদলে যেতে পারে। সম্প্রতি নেচার হেলথ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের ধরন ও খাবারের সময় ঘুমের ওপর ‘তাৎক্ষণিক ও পরিমাপযোগ্য প্রভাব’ ফেলতে পারে। খাবার ও বিশ্রামের এই সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু গবেষণা সামনে এনেছে।


ভালো ঘুমের জন্য কী খাবেন?

এমন কোনো ‘বিশেষ ঘুমের ডায়েট’ নেই, যা অনুসরণ করলেই টানা আট ঘণ্টা নিশ্চিন্ত ঘুম নিশ্চিত হবে। তবে, নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান ও ব্রিটিশ ডায়েটেটিক অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ডালহিয়া ক্যাম্পবেলের মতে, ভূ-মধ্যসাগরীয় ধাঁচের খাবার এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাছাকাছি। তার ভাষায়, এটি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস, যেখানে প্রচুর ফল ও সবজি, পূর্ণ শস্য, কম চর্বিযুক্ত প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে। এসব খাবার শরীরে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।


নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান রিসার্চের পরিচালক অধ্যাপক মেরি-পিয়েরে সেন্ট-ওঁজ উদ্ভিদনির্ভর খাবার, বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা কিছু উপাদান প্রদাহ কমাতে ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে। একইসঙ্গে, কিছু পুষ্টি উপাদান অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টি বা গাট মাইক্রোবায়োমকে সহায়তা করে, যা মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগের সঙ্গেও যুক্ত। এর ফলে মন কিছুটা শান্ত হতে পারে এবং ঘুমও ভালো হতে পারে।


নির্দিষ্ট কোনো খাবার কি ঘুম ভালো করে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নির্দিষ্ট খাবারের দিকে নজর না দিয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে মনোযোগ দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পবেল বলেন, “যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ খাদ্য ও পুষ্টি জরিপ অনুযায়ী, ১৭ শতাংশেরও কম প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিদিনের প্রস্তাবিত পরিমাণ ফল ও সবজি খাওয়ার লক্ষ্য পূরণ করেন। তাই খাদ্যতালিকায় ফল ও সবজির পরিমাণ বাড়ানো সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও ঘুম—দুই ক্ষেত্রেই উপকারী হতে পারে।” তবে, কিছু ফল ও সবজি নিয়ে ঘুমের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেন্ট-ওঁজের মতে, টমেটো, কলা ও আনারসের মতো কিছু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল এবং কমলা ঘুমের জন্য উপকারী হতে পারে। বাদাম ও বীজ, বিশেষ করে পেস্তা ও আখরোট, পাশাপাশি পূর্ণ শস্যও ভালো ঘুমে ভূমিকা রাখতে পারে।


কিউই ফল নিয়েও কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে, এ বিষয়ে প্রমাণ এখনো সীমিত। টক চেরি নিয়েও প্রাথমিক গবেষণা হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এটি ঘুমের মোট সময়, ঘুমের কার্যকারিতা বা ঘুমিয়ে পড়ার সময়ের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি আনতে পারে। তবে, এ ক্ষেত্রেও গবেষণা এখনো সীমিত এবং ফলাফল পুরোপুরি একরকম নয়।


বেশি প্রোটিন খেলে কি ঘুম ভালো হয়?

বেশি প্রোটিনযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ভালো ঘুমের একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে কিছু গবেষণায়। অধ্যাপক সেন্ট-ওঁজের মতে, প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে ট্রিপটোফ্যান থাকে। এই অ্যামিনো অ্যাসিড শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরিতে প্রয়োজনীয়, আর দুটিই ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। ট্রিপটোফ্যান শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। তাই খাবারের মাধ্যমে এটি গ্রহণ করতে হয়। প্রাণিজ প্রোটিনের পাশাপাশি অনেক উদ্ভিজ্জ প্রোটিনেও ট্রিপটোফ্যান থাকে। দুধ, ডিম, মাছ, সামুদ্রিক খাবার, মাংস, পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ ও ডালজাতীয় খাবার ট্রিপটোফ্যানের উৎস হতে পারে। এসব খাবার খাওয়ার সঙ্গে মোট ঘুমের সময় ও ঘুমের কার্যকারিতা ভালো হওয়ার সম্পর্কও কিছু গবেষণায় পাওয়া গেছে। তাহলে ঘুমানোর আগে গরম দুধ খাওয়া কি উপকারী? এ বিষয়ে শক্তিশালী গবেষণার প্রমাণ নেই যে গরম দুধ সরাসরি ঘুম ভালো করে। তবে, ঘুমানোর আগে দুধ খেতে চাইলে সেটি বাদ দেওয়ারও কোনো কারণ নেই।


কোন খাবার ঘুম নষ্ট করতে পারে?

পুষ্টিগুণ কম কিন্তু চর্বি ও চিনির পরিমাণ বেশি; এমন খাবার ভালো ঘুমের জন্য খুব একটা সহায়ক নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক সেন্ট-ওঁজের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার খান, তাদের মধ্যে অনিদ্রার উপসর্গের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা জিআইযুক্ত খাবার নিয়েও একই ধরনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। উচ্চ জিআই খাবার দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে। এর মধ্যে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটজাত খাবার যেমন সাদা পাউরুটি, আলু, ডোনাট, ব্যাগেল, মিষ্টি, চিনি মেশানো সিরিয়াল ও চিনিযুক্ত পানীয় রয়েছে। শুধু অতিরিক্ত চিনি নয়, অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবারও কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সেন্ট-ওঁজ।


চা-কফির ক্যাফেইন ঘুমের বন্ধু, নাকি শত্রু?

ক্যাফেইনকে ‘দুই ধারী তলোয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিজ্ঞানী ড. স্যামি গিল। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত মাত্রায় ক্যাফেইন—প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম বা দিনে চার কাপ কফির সমপরিমাণ—মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সজাগতা বাড়াতে পারে। কিন্তু বেশি ক্যাফেইন উদ্বেগ, বিরক্তি ও অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তবে, সবার ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের প্রভাব এক নয়। কেউ কেউ অন্যদের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল। এর পেছনে জেনেটিক কারণও থাকতে পারে। তবে, দিনের কোন সময়ে ক্যাফেইন গ্রহণ করছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ক্যাফেইনের শরীরে থাকার সময় তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ। দুপুরের খাবারের সময় কফি পান করলে মধ্যরাতের কাছাকাছিও এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ শরীরে থাকতে পারে, যা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।


তাই দুপুরের পর ক্যাফেইন বাদ দিলে অনেকের ঘুমের মান ও পরিমাণে দৃশ্যমান উন্নতি হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ক্যাফেইন শরীরে বিপাক হওয়ার ধরনও বদলে যেতে পারে। ফলে আগে রাতের খাবারের পর যে কফি পান করেও ঘুমের সমস্যা হতো না, বয়স বাড়ার পর সেটিই ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।


ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল কি কাজে দেয়?

অনেকে মনে করেন, এক-দুই পেগ অ্যালকোহল খেলে দ্রুত ঘুম আসে। কথাটি আংশিক সত্য হলেও এটিকে ঘুমের সহায়ক বলা যায় না। ড. গিলের মতে, অ্যালকোহল একটি সেডেটিভ বা প্রশমক। এটি দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিক ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করে না। অল্প পরিমাণ অ্যালকোহলও REM sleep কমিয়ে দিতে পারে। ঘুমের এই পর্যায়টি আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, অ্যালকোহল ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের ওপর প্রভাব ফেলে, ফলে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। পরদিন ক্লান্তিও লাগতে পারে। অ্যালকোহল অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যাও বাড়াতে পারে।


রাতের খাবার খাওয়ার কতক্ষণ পর ঘুমাবেন?

গবেষণায় দেখা গেছে, দেরিতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম মানের ঘুমের সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ঘুমানোর মাত্র এক ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খাওয়া ঘুমের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা কমার সঙ্গে সম্পর্কিত। খাবার হজমের কাজে শরীর ব্যস্ত থাকায় দ্রুত ঘুমিয়ে পড়াও কঠিন হতে পারে।অধ্যাপক সেন্ট-ওঁজের পরামর্শ, সাধারণভাবে খাবার খাওয়ার পর ঘুমাতে যাওয়ার আগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করা ভালো। যাদের অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঘুমানোর চার ঘণ্টা আগে পর্যন্ত খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ রয়েছে। রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে বেশি পানি, চা বা অন্য পানীয় পান করাও সমস্যা তৈরি করতে পারে। এতে রাতে ঘুম ভেঙে বাথরুমে যেতে হতে পারে।


ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যাবেন?

রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলেছেন, কিন্তু ঘুমানোর আগে আবার ক্ষুধা লাগছে—এমন হলে হালকা কিছু খাওয়া যেতে পারে। কারণ একেবারে খালি পেটে ঘুমাতেও সমস্যা হতে পারে। ড. গিলের মূল পরামর্শ হলো—খুব বেশি পেট ভরা অবস্থায়ও নয়, আবার খুব ক্ষুধার্ত অবস্থাতেও নয়; মাঝামাঝি অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়া ভালো। হালকা ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে দইয়ের সঙ্গে ফল ও বাদাম, কিংবা পূর্ণ শস্যের পাউরুটির সঙ্গে বাদামের মাখন ও কলা খাওয়া যেতে পারে। বিস্কুট বা চকলেটের মতো খাবার বারবার খাওয়ার চেয়ে এগুলো ভালো বিকল্প।


ঘুম কম হলে কেন বেশি ক্ষুধা লাগে?

পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক রাত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ঘ্রেলিনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ঘ্রেলিন ক্ষুধা বাড়ানোর সংকেত দেয়। একই সময়ে লেপটিনের মাত্রা কমতে পারে, যে হরমোন শরীরকে তৃপ্ত বা পেট ভরা থাকার সংকেত দেয়। ফলে কম ঘুমের পর মানুষ বেশি খেতে পারে। বিশেষ করে বেশি চর্বি ও কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের দিকে ঝোঁক বাড়তে পারে। একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যারা ঘুম থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তারা পরদিন পর্যাপ্ত ঘুমানো ব্যক্তিদের তুলনায় গড়ে প্রায় ৩৮৫ ক্যালরি বেশি গ্রহণ করেছেন।


অধ্যাপক সেন্ট-ওঁজের গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে এই হরমোনগত পরিবর্তনের ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে ফলাফল একই—অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। বিষয়টি শুধু ক্ষুধার হরমোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কম ঘুম হলে মস্তিষ্কের পুরস্কার বা আনন্দ-সংশ্লিষ্ট অংশও প্রভাবিত হয়। ফলে মুখরোচক ও আনন্দদায়ক খাবার আরও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। অর্থাৎ আগের রাতে ভালো ঘুম না হলে পরদিন স্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে মিষ্টি বা বেশি মুখরোচক খাবারের দিকে হাত বাড়ানোর সম্ভাবনা বাড়তে পারে।


কম ঘুম কি ওজন বাড়াতে পারে?

দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত ঘুম না পাওয়া ও ওজন বাড়ার মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে। ক্যাম্পবেলের মতে, যারা নিয়মিত ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান, তাদের সময়ের সঙ্গে ওজন বাড়ার প্রবণতা বেশি হতে পারে। অন্যদিকে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম বাড়ানোর মাধ্যমে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। কম ঘুমের কারণে ক্ষুধার হরমোনের পরিবর্তনের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না পাওয়া মানুষ তুলনামূলক কম ফল ও সবজি এবং বেশি চিনি, কম প্রোটিন ও কম ফাইবার গ্রহণ করতে পারেন।


রাতে বেশি সময় জেগে থাকলে মাঝরাতে ক্ষুধা লাগার সম্ভাবনাও বাড়ে। আবার ক্লান্ত থাকার কারণে শরীরচর্চা বা ঘরে পুষ্টিকর খাবার তৈরির আগ্রহ কমে যেতে পারে। তখন দ্রুত তৈরি হয় এমন কম পুষ্টিকর খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।

কখন ঘুমাতে যাচ্ছেন, সেটিও কি খাবারের ওপর প্রভাব ফেলে?


গবেষণার একটি অংশে মানুষের ‘ক্রোনোটাইপ’ বা শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও জাগরণের সময়ের ধরন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

যারা তুলনামূলক আগে ঘুমান ও আগে জাগেন, তাদের খাদ্যাভ্যাস সাধারণত স্বাস্থ্যকর হওয়ার এবং বেশি শরীরচর্চা করার প্রবণতা দেখা যায়। একই সঙ্গে তাদের ঘুমের সময়ও সামাজিক সময়সূচির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় পর্যাপ্ত ঘুম পাওয়া সহজ হতে পারে।

তবে কে সকালে সক্রিয় আর কে রাতে বেশি সক্রিয়—এটি অনেকটাই জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।


যারা রাতের শিফটে কাজ করেন?

রাতের শিফটে কাজ করা মানুষের খাদ্যাভ্যাস দিনের বেলায় কাজ করা মানুষের তুলনায় তুলনামূলক কম স্বাস্থ্যকর হতে পারে। শিফটের কাজের সঙ্গে হৃদ্‌রোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। ক্যাম্পবেলের পরামর্শ, রাতের শিফট শুরু হওয়ার আগে দিনের প্রধান খাবারটি খেয়ে নেওয়া এবং রাতে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো। তবে, বাস্তবে এটি সবসময় সহজ নয়। অধ্যাপক সেন্ট-ওঁজের মতে, রাতের শিফটে কর্মীরা মাঝরাতে খাওয়ার জন্য নানা ধরনের মুখরোচক খাবার সঙ্গে নিয়ে আসেন। তাই শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, রাতের শিফটের পুরো খাদ্যসংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন।


ঘুমের জন্য ম্যাগনেশিয়াম খাবেন?

বিশেষজ্ঞরা প্রথমেই সাপ্লিমেন্টের দিকে না গিয়ে ঘুমের মৌলিক অভ্যাস ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছেন। নিয়মিত ঘুমের সময়, খাবারের সময়, ঘরের তাপমাত্রা, আলো, মানসিক চাপ, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল গ্রহণ এবং শারীরিক কর্মকাণ্ড—এসবের দিকে আগে নজর দেওয়া উচিত। খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ঠিক করার পরও যদি সমস্যা থাকে, তখন ম্যাগনেশিয়াম নিয়ে ভাবা যেতে পারে। তবে ম্যাগনেশিয়াম ঘুম ভালো করে—এমন প্রমাণ এখনও শক্তিশালী নয়। কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় ঘুমের সঙ্গে এর ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে, আবার শক্তিশালী নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় ফলাফল একরকম নয়। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় খারাপ ঘুমের অভিযোগ থাকা কিছু প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে ম্যাগনেশিয়াম গ্লাইসিনেট গ্রহণে অনিদ্রার মাত্রায় সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। আরেকটি গবেষণায় ম্যাগনেশিয়াম থ্রিওনেট গ্রহণকারীদের ঘুমের মান ও দিনের বেলার সজাগতায় কিছু উন্নতির কথা পাওয়া গেছে।


বাড়তি ভিটামিন কি ঘুম ভালো করে?

বি ভিটামিন ও ভিটামিন ডি ঘুমের জন্য উপকারী—এমন ধারণা প্রচলিত। তবে নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অধ্যাপক সেন্ট-ওঁজের মতে, সাধারণ খাদ্যতালিকাতেই বি ভিটামিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় এবং অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এর ঘাটতি দেখা যায় না। ভিটামিন ডির ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। শরীর সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তা পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।


মেলাটোনিন কি ঘুমের ওষুধ?

মেলাটোনিন এমন একটি হরমোন, যা শরীরের ঘুম ও জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা বাড়ে এবং শরীর ও মস্তিষ্ককে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সংকেত দেয়। ড. গিলের ব্যাখ্যায়, মেলাটোনিনকে ঘুমের ‘অন-অফ সুইচ’ হিসেবে ভাবা ঠিক নয়। বরং এটি অনেকটা আলো কমানোর ডিমারের মতো—ধীরে ধীরে শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে। তাই অনিদ্রায় ভোগা সবাইকে নিয়মিত মেলাটোনিন সাপ্লিমেন্ট খেতে হবে—এমন নয়। বরং ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটি বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে জেট ল্যাগ বা দীর্ঘ ভ্রমণের পর সময়ের পার্থক্যের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে মেলাটোনিন সহায়ক হতে পারে।


ভালো ঘুমের জন্য শুধু একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর করার চেয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কখন খাবেন, কী খাবেন, ক্যাফেইন কখন বন্ধ করবেন, ঘুমানোর আগে কতটা খাবেন—এসব ছোট অভ্যাসই ঘুমের মানে প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খুব বেশি পেট ভরে নয়, আবার খালি পেটেও নয়—পরিমিত খাবার খেয়ে ঘুমানো। আর ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে শুধু খাবার বা সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর না করে এর পেছনে থাকা অন্য কারণগুলোও বিবেচনা করা জরুরি।