মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বেইজিং সফরের শেষ দিনটি কাটিয়েছেন চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির অত্যন্ত গোপনীয় এবং কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত সদরদপ্তর ‘ঝংনানহাই’-তে। চীনের ক্ষমতার এই কেন্দ্রবিন্দুটিকে প্রায়শই যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস বা রাশিয়ার ক্রেমলিনের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ডিজিটাল মানচিত্রেও এর ছবিগুলো ঝাপসা করে রাখা হয়। বেইজিংয়ের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই শতাব্দীপ্রাচীন লাল দেয়াল ঘেরা চত্বরে প্রবেশ করার সৌভাগ্য হাতেগোনা কয়েকজন মার্কিন নেতারই হয়েছে। সফরের শেষ সকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই ঐতিহাসিক চত্বরের মনোরম বাগানে একসঙ্গে হেঁটে বেড়ান। সেখানে ট্রাম্প বাগানের গোলাপ ফুলের প্রশংসা করলে শি জিনপিং তাকে উপহার হিসেবে সেই ফুলের বীজ দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং পরবর্তীতে তারা চা চক্র ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজেই এই বিশেষ স্থানে ট্রাম্পকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যখন তিনি ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে গিয়েছিলেন, সেখানে ট্রাম্প তাকে যেভাবে উষ্ণ আতিথেয়তা দিয়েছিলেন, তারই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি এবার ট্রাম্পকে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই রাজনৈতিক কেন্দ্রে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। শি জিনপিং ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন, ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাও সেতুং, চৌ এনলাই, দেং জিয়াওপিং, জিয়াং জেমিন এবং হু জিনতাওয়ের মতো চীনের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এখানে বসবাস ও কাজ করেছেন এবং বর্তমানে তিনিও এখানেই থাকেন। বাগানে হাঁটার সময় জিনপিং সেখানকার গাছপালার প্রাচীন ইতিহাস তুলে ধরেন এবং প্রায় ৪৯০ বছর পুরোনো একটি গাছ দেখিয়ে ট্রাম্পকে সেটি স্পর্শ করতে উৎসাহিত করেন। এই রাজকীয় পরিবেশ দেখে মুগ্ধ ট্রাম্প বলেন, জায়গাটি সত্যিই চমৎকার এবং তিনি এর সঙ্গে সহজেই অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারবেন। ঐতিহাসিকভাবে ‘ঝংনানহাই’ ছিল এক সময় চীনের সম্রাটদের অবসর যাপনের রাজকীয় বাগান। ১৯১২ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর এটি রাষ্ট্রপতির বাসভবনে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর মাও সেতুং এটিকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বেছে নেন। মাও মূলত ব্যর্থ রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অতীত থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে এবং কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে সম্রাটদের মূল প্রাসাদ ফরবিডেন সিটি বর্জন করে এই স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন। এর আগে ১৯৭২ সালে প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে রিচার্ড নিক্সন এখানে এসে মাও সেতুংয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরবর্তীতে জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে বারাক ওবামা এখানে সফর করেন। বিশ্ব রাজনীতির এই ঐতিহাসিক ও গোপনীয় কেন্দ্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরটি দুই পরাশক্তির বর্তমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।