শনিবার ২২ আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৭ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: August 22, 2026
August 22, 2026
আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে লাভ কার

Published: August 22, 2026 at 12:32 PM
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে লাভ কার

যুদ্ধকে সাধারণত একটি দ্বিমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়। কৌশলগত বিশ্লেষক, নীতিনির্ধারক এবং গণমাধ্যম একটি সহজ প্রশ্নের উপর মনোযোগ দিতে চায় কে জিতেছে এবং কে হেরেছে? সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান যুদ্ধও একই ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটন কি তার উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করতে পেরেছে? ইরান কি সফলভাবে মার্কিন সামরিক চাপ প্রতিহত করতে এবং প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বজায় রাখতে পেরেছে? কিন্তু এই দ্বিমুখী কাঠামোটি আধুনিক যুদ্ধের আরেকটি দিককে উপেক্ষা করে, যা প্রায়শই আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধ শুধু সামরিক বিজয়ী এবং পরাজিত পক্ষই তৈরি করে না। এগুলো সম্পদের পুনর্বণ্টন ঘটায়, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে এবং নিরাপত্তাহীনতা থেকে লাভবান হতে পারে এমন শিল্পগুলোর জন্য বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করে। মার্কিন-ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রে, সবচেয়ে সুস্পষ্ট সুবিধাভোগী শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন বা তেহরান কেউ-ই নাও হতে পারে। ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধের জন্য চড়া মূল্য দিয়েছে। তারা সামরিক সম্পদ ব্যয় করেছে, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে এবং বিভিন্ন মাত্রার কৌশলগত ও রণনৈতিক যন্ত্রণা ভোগ করেছে। তাই এই সংঘাত হয়তো কোনো স্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বিজয়ী তৈরি করবে না। তবুও বেশ কয়েকটি খাত সুস্পষ্ট বাণিজ্যিক বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মার্কিন-ইরান সংঘাতের প্রধান সুবিধাভোগী হয়েছে প্রতিরক্ষা শিল্প। আধুনিক যুদ্ধে বিপুল পরিমাণে ক্ষেপণাস্ত্র, ইন্টারসেপ্টর, ড্রোন, নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী যুদ্ধাস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিস্থাপন করতে হয়। প্রতিটি হ্রাসপ্রাপ্ত মজুত নতুন সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। প্রতিটি অনুভূত দুর্বলতা অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। প্রধান মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর আর্থিক ফলাফল এই গতিশীলতার চিত্র তুলে ধরে। লকহিড মার্টিন ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে এই আয় ছিল মাত্র ৩৪২ মিলিয়ন ডলার। সংস্থাটির যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং এর অর্ডারকৃত পণ্যের পরিমাণ রেকর্ড ২৩০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর ক্ষেপণাস্ত্র ও ফায়ার কন্ট্রোল বিভাগে বিক্রি ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা ঠিকাদার রেথিওনের মূল সংস্থা আরটিএক্স জানিয়েছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে তাদের নিট আয় হয়েছে ২ দশমিক ১৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের একই ত্রৈমাসিকের ১ দশমিক ৬৫৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেশি। প্যাট্রিয়ট, স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল এবং অ্যামরামের মতো সিস্টেমের চাহিদার কারণে রেথিওনের বিক্রি ১৮ শতাংশ বেড়ে ৮ দশমিক ২৬৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু অস্ত্রের তাৎক্ষণিক ব্যবহারই বাড়ায় না বরং চাহিদার একটি দ্বিতীয় তরঙ্গও তৈরি করে, অর্থাৎ মজুত ভান্ডার পুনরায় পূরণ করা। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত এই সংস্থাগুলোর জন্য একটি বহু-বছরের সংগ্রহ চক্রে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতা যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, সরকারগুলো তত বেশি অতিরিক্ত অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অর্ডার করতে বাধ্য হয়। সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের জন্য, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তাদের অর্ডারের পরিধি বাড়াতে পারে। জ্বালানি খাতের কিছু সংস্থাও যুদ্ধের আরেকটি প্রধান সুবিধাভোগী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি প্রবাহে বিঘ্ন- এই সবকিছু মিলে ঠিক সেই পরিস্থিতিই তৈরি করেছে, যেখানে বড় তেল কোম্পানি, শোধনাগার ও পণ্য ব্যবসায়ীরা উচ্চ মূল্য, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বাজারের চরম অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে। এর পরিসংখ্যান বেশ চমকপ্রদ। এক্সনমোবিলের ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে নিট আয় ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের ৭ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ১০৫ শতাংশ বেশি। একইভাবে, শেভরনের আয় নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ম্যারাথন পেট্রোলিয়াম, ফিলিপস ৬৬ ও ভ্যালেরো এনার্জিও বড় ধরনের লাভ করেছে। কারণ জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং পরিশোধন মার্জিন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে অসাধারণ আর্থিক লাভে রূপান্তরিত করেছে। এই প্রবণতা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শেল ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ৯ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা ঘোষণা করেছে, যেখানে ২০২৫ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে মুনাফা ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার মুনাফা ঘোষণা করেছে, যা একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। টোটালএনার্জিস, সৌদি আরামকো, গ্লেনকোর এবং ট্রাফিগুরাও এই সংঘাত ও এর ফলে জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা থেকে লাভবান হয়েছে। মূল কথাটি এমন নয় যে প্রতিটি জ্বালানি কোম্পানি প্রতিটি যুদ্ধ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভবান হয়। সংঘাত অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে, উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে এবং বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিন্তু মার্কিন-ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে যে, সরবরাহে ব্যাঘাত এবং অনিশ্চয়তা কীভাবে সেইসব কোম্পানির জন্য অসাধারণ লাভ তৈরি করতে পারে, যারা অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করতে, অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে এবং উচ্চমূল্যকে কাজে লাগাতে সক্ষম। অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য, অস্থিতিশীলতাই লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক যুগে সংঘাতের সুবিধাভোগীরা এখন আর শুধু ট্যাঙ্ক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধ ক্রমশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, স্যাটেলাইট ডেটা, সাইবার নিরাপত্তা এবং রিয়েল-টাইম যুদ্ধক্ষেত্র বিশ্লেষণের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই রূপান্তরের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিস আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে সংস্থাটি ১ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা আয় করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৯৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। মার্কিন সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮০৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মাইক্রোসফট মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য মাইক্রোসফট ৩৬৫, ক্লাউড সাবস্ক্রিপশন এবং অন্যান্য পরিষেবার জন্য পেন্টাগনের কাছ থেকে ৯ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি পাঁচ বছরের চুক্তিও পেয়েছে। একই সময়ে, পেন্টাগন এআই কোম্পানিগুলোকে গোপনীয় নেটওয়ার্কগুলোতে তাদের সক্ষমতা প্রসারিত করতে উৎসাহিত করছে, যা সামরিক ও গোয়েন্দা উদ্দেশ্যে সুরক্ষিত এআই সিস্টেম তৈরি করতে সক্ষম সংস্থাগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। যুদ্ধ-সৃষ্ট লাভের আরেকটি উদাহরণ হলো বৈশ্বিক জাহাজ শিল্প। হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জাহাজগুলোকে তাদের পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হতে হয় এবং বৈশ্বিক জাহাজ বাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর ফলে মালবাহী ভাড়ার বৃদ্ধি ট্যাঙ্কার পরিচালনাকে একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তরিত করেছে। ফ্রন্টলাইন এবং স্করপিও ট্যাঙ্কার্স হলো এর কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যারা ২০২৬ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে রেকর্ড পরিমাণ আয় করেছে। এছাড়াও কিছু কম দৃশ্যমান সুবিধাভোগীও রয়েছে। প্রতিরক্ষা পরামর্শক, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ক সংস্থা, গোয়েন্দা পরিষেবা প্রদানকারী, বেসরকারি নিরাপত্তা ঠিকাদার এবং ডিজিটাল মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা হচ্ছেন এই কম দৃশ্যমান সুবিধাভোগী।

সূত্র: ডন অনলাইন