গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে হামালা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। টানা ৩৯ দিন এই হামলা অব্যাহত থাকে। পরে গত ৮ এপ্রিল অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইরানের সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন জানিয়েছে, রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এই যুদ্ধে খরচ হয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলার। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও মার্কিন কংগ্রেসকে এই ব্যয় বলা হয়েছিল ২৫ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে মাত্র দুই সপ্তাহে আরও চার বিলিয়ন ডলার বেড়েছে ব্যয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়ে বহুগুণ বেশি হতে পারে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের জননীতি বিশেষজ্ঞ লিন্ডা বিলমেসের হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের চূড়ান্ত ব্যয় মার্কিন করদাতাদের জন্য অন্তত এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
পেন্টাগনের নতুন হিসাব
পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নতুন ব্যয় হিসাবের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও প্রতিস্থাপন ব্যয়, পাশাপাশি যুদ্ধ পরিচালনার অপারেশনাল খরচ যুক্ত করা হয়েছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছিল, পেন্টাগনের পূর্বের ২৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাব বাস্তবতার তুলনায় অনেক কম ছিল। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের ব্যয় সেই হিসাবে ধরা হয়নি।
কোথায় যাচ্ছে এত অর্থ?
বিশেষজ্ঞ লিন্ডা বিলমেস এপ্রিল মাসে এক অনলাইন বিশ্লেষণে যুদ্ধের ব্যয়কে স্বল্পমেয়াদি এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি- এই দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেন। স্বল্পমেয়াদি ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে-
১. ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের খরচ
২. দুই থেকে তিনটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ বহরের রক্ষণাবেক্ষণ
৩. সেনাসদস্যদের বেতন ও যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত ভাতা
৪. যুদ্ধবিমান ও ড্রোনসহ ধ্বংস বা হারিয়ে যাওয়া সামরিক সম্পদের ক্ষতি
বিলমেস বলেন, পুরোনো অস্ত্রের বর্তমান প্রতিস্থাপন ব্যয় অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের তালিকাভুক্ত মূল্য প্রায় ২০ লাখ ডলার হলেও বর্তমানে সেটি নতুন করে তৈরি করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের বড় অর্থনৈতিক চাপ সামনে আরও স্পষ্ট হবে।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে-
১. আগামী ৪ থেকে ৫ বছরে সামরিক স্থাপনা মেরামত
২. আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র দিয়ে সামরিক ভাণ্ডার পুনর্গঠন
৩. মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৫৫ হাজার মার্কিন সেনার চিকিৎসা ও ভেটেরান সহায়তা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রাসায়নিক, ধোঁয়া ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানের সংস্পর্শে আসায় বহু সেনা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে পারেন।
বাড়ছে জ্বালানির দাম
যুদ্ধের সরাসরি সামরিক ব্যয়ের বাইরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে দ্রুত।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় খুচরা মূল্য প্রতি গ্যালন ৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
মার্কিন করদাতাদের উদ্বেগ বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। তাদের মতে, ইরান যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে- সেই অনিশ্চয়তাই এখন ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।