যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহারণ। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। তবে মাঠের এই লড়াই ছায়া হয়ে উঠেছে ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণ। গ্যালারি থেকে শুরু করে মাঠের তারকাদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট। দুই দেশের রাজনৈতিক অবস্থান ফুটবল মাঠকে এক পরোক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ দিয়েছে। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগী এখন এই ম্যাচকে দেখছেন ভিন্ন চোখে।
আর্জেন্টিনার কট্টর ইসরায়েলপন্থি নীতি
আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই কট্টর ডানপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তিনি ইসরায়েলকে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। তার সরকার নিয়মিতভাবে ইসরায়েলকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। ফুটবল কূটনীতিতেও এই সম্পর্কের প্রভাব বেশ স্পষ্ট।
স্পেনের ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান
আর্জেন্টিনার ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন। স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকার গাজা সংকটের শুরু থেকেই ইসরায়েলের কট্টর সমালোচক। ২০২৪ সালের মে মাসে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে দেশটির সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ফাটল ধরে।
ট্রাম্প বনাম স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই ইসরায়েলের বড় সমর্থকদের একজন। অন্যদিকে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার। ইসরায়েল ইস্যুতে ট্রাম্পের সঙ্গে স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর বিরোধ বহুল আলোচিত বিষয়। রোববার (১৯ জুলাই) স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনাল ম্যাচ দেখতে মাঠে উপস্থিত থাকবেন দুইজনই। ফলে, মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে এই দুই নেতার উপস্থিতি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা তৈরি করবে। লামিন ইয়ামালের ভাইরাল ছবি ও ফিলিস্তিনিদের আবেগ রাজনীতির এই উত্তাপ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে স্পেনের ১৮ বছর বয়সী তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামালকে কেন্দ্র করে। কয়েক মাস আগে বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা শিরোপা উদযাপনের সময় ইয়ামাল হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে নেন। খোলা ছাদের বাসে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে তার সেই ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ইয়ামালের এই সংহতি প্রকাশ ফিলিস্তিনি ফুটবল ভক্তদের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করে। গাজার সাধারণ মানুষ এখন ইয়ামালকে তাদের নিজেদের প্রতিনিধি মনে করছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রীও ইয়ামালের এই সাহসী অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। ফলে ইয়ামাল মাঠে নামা মানেই ফিলিস্তিনিদের এক অলিখিত সমর্থন ছড়িয়ে পড়া ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসির জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে। তবে অতীতে মেসির ইসরায়েল সফর এবং দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি ইসরায়েলিদের কাছে তাকে অত্যন্ত প্রিয় করে তুলেছে। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন জানানোর পেছনে মেসির জনপ্রিয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন। এর ফলে মাঠে যখন মেসি ও ইয়ামাল মুখোমুখি হবেন, তখন সেটি কেবল দুই প্রজন্মের ফুটবল লড়াই থাকবে না। সেটি হয়ে উঠবে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সমর্থকদের এক অদৃশ্য লড়াইয়ের মঞ্চও।
খেলার মাঠে ভূরাজনীতির ছায়া
ফুটবলকে সবসময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার দাবি করা হলেও ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। এবারের বিশ্বকাপ প্রমাণ করছে, খেলাধুলা এবং বিশ্ব রাজনীতি কতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে, ইরানের ফুটবলারদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণ তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। মিশরের সঙ্গে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোও বহুল আলোচিত হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় মিশর: ভাগ্য যাদের বারবার কাঁদায় বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও মিশর। সেই ম্যাচে এক আর্জেন্টিনার এক সমর্থক গ্যালারি থেকে মিশরের কোচ হোসাম হাসানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের পতাকা দেখান। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের পর মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে উদযাপন করেছিলেন মিশরের কোচ। তার জবাব দিতেই ওইদিন ইসরায়েলি পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করেন আর্জেন্টিনার সেই সমর্থক। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। আজ আবার মাঠে নামছে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর পছন্দের দল আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া স্পেন। মাঠের রেফারি বাঁশি বাজানোর পর ফুটবলাররা হয়তো কেবল বলের পেছনেই ছুটবেন। তবে গ্যালারিতে এবং টেলিভিশনের পর্দার সামনে থাকা কোটি কোটি মানুষের মন পড়ে থাকবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে। এই ফাইনাল তাই কেবল ট্রফি জয়ের নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির দুই ভিন্ন মতাদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, নিউ আরব