মস্তিষ্কে স্ট্রোকের ঘটনা বেড়ে চলছে সারা দেশে| এমন সময়ে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের ডাক্তাররা সার্জারি না করেই স্ট্রোক নিরাময়ের নতুন পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেছেন|
৭ এপ্রিল, শনিবার সংবাদ মাধ্যম ইউএনবির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য দেওয়া হয়|
নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এবং নিউরোইন্টারভেনশন টিমের বিশেষজ্ঞ ড. সিরাজী শফিকুল ইসলাম ইউএনবিকে জানিয়েছে, উন্নত দেশগুলোতে ‘অল্টেপ্লেজ’ নামের একটি ইনজেকশন ব্যবহার করে স্ট্রোকের চিকিৎসা করা হয়| স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেবার পর সাড়ে চার ঘণ্টা পার হয়ে গেলে রোগীর হাতের রক্তনালীতে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়| এতে যে ব্লাড ক্লট বা রক্তপিণ্ডের কারণে স্ট্রোক হয়েছে তা অপসারিত হয়|
তবে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেবার সাড়ে চার ঘণ্টার আগেই যদি চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়, তাহলে ‘মেকানিক্যাল থ্র¤ে^কটমি’ নামের একটি চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়| এই পদ্ধতিকে ‘স্টেন্ট রিট্রিভার’ও বলা হয়
মেকানিক্যাল থ্র¤ে^কটমি পদ্ধতিতে কোন সার্জারির প্রয়োজন হয় না| সিঙ্গাপুর, জাপান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এই চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার হয়| বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর ব্যবহার শুরু হয়েছে, জানিয়েছেন ড. সিরাজি শাফিকুল ইসলাম|
প্রথমত, সিটি স্ক্যান এবং অ্যানজিওগ্রাম টেস্টের মাধ্যমে ব্লাড ক্লট শনাক্ত করা হয়| এরপর রক্তনালীর ভেতর দিয়ে ওই ব্লাড ক্লট পর্যন্ত একটি ক্যাথেটার প্রবেশ করানো হয়| এরপর ওই ব্লাড ক্লট রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়, ব্যাখ্যা করেন ডাক্তার|
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে সফলভাবে মেকানিক্যাল থ্র¤ে^কটমির মাধ্যমে স্ট্রোকের চিকিৎসা করা হয়| ৫৫ বছর বয়সী হারুন-উর-রশিদকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে এনে ক্যাথ ল্যাবে মেকানিকাল থ্র¤ে^কটমি প্রক্রিয়ায় আধা ঘণ্টার মাঝেই তার চিকিৎসা সম্পন্ন হয়|
ডা. সিরাজি শাফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রোগীর মস্তিষ্কের ডানদিকে বেশ কয়েকটি জায়গায় রক্ত জমাট বেধে গিয়েছিল এবং তার শরীরের বাম দিকটি ইতোমধ্যেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল| আমরা তার জীবন বাঁচাতে পেরেছি| তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে তার বেশ কিছুটা সময় লাগবে| ’
রোগীর ভাই জাফর ইকবাল ইউএনবিকে জানিয়েছেন, চিকিৎসার দুই দিন পর থেকেই তার ভাইয়ের শারীরিক অবস্থায় উন্নতি দেখা গেছে| তিনি এখনো চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে আছেন|
এই চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল, জানিয়েছেন ড. সিরাজি| বর্তমানে এর খরচ পড়ে ৩-৪ লাখ টাকা| তবে ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা পেলে এর দাম কমে আসবে বলে আশা রাখেন তিনি|
যেসব হাসপাতালে ইতোমধ্যেই ক্যাথ ল্যাবের সুবিধা আছে, সরকারি সহযোগিতায় এসব ক্যাথ ল্যাব আরও উন্নত করলে সেখানেও এই চিকিৎসা সম্ভব| ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার সুযোগ পাবে| এর পাশাপাশি নিউরোলজিস্টদের এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়াটাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি| অন্যদিকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ড. মো. বদরুল আলম ইউএনবিকে জানিয়েছেন, এই চিকিৎসা পদ্ধতি শেখার জন্য প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিশেষজ্ঞদের বিদেশ পাঠানো হয়েছে|
মেকানিক্যাল থ্র¤ে^কটমি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি অল্টেপ্লেজ ইঞ্জেকশনের ব্যবস্থাও দ্রুত চালু হবে এদেশে, জানিয়েছেন ড. বদরুল আলম| একটি কোম্পানি এই ইঞ্জেকশনের লাইসেন্স পেয়েছে সম্প্রতি|
ইউএনবি জানিয়েছে, গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যুর তৃতীয় বৃহত্তম কারণ হলো স্ট্রোক| আর বিশ্ব ¯^াস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোকে মৃত্যুর দিকে দিয়ে সারা পৃথিবীতে ৮৪তম হলো বাংলাদেশ|
জীবনধারায় পরিবর্তন আসার কারণে দিন দিন বাড়ছে স্ট্রোকের আশঙ্কা| এমন সময়ে এই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি বেশ উপকারী হয়ে ওঠতে পারে| এ ক্ষেত্রে জনগণের কল্যাণে সরকারেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন, জানিয়েছেন ডাক্তাররা|