মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নির্ধারিত শান্তি আলোচনা শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়ায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, শুক্রবার (১৮ জুন) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠক আপাতত হচ্ছে না। একই সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সুইজারল্যান্ড সফরের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত ভঙ্গুর শান্তি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, এই আলোচনার লজিস্টিক ব্যবস্থা কখনোই সহজ বা পূর্বানুমানযোগ্য ছিল না। তিনি জানান, সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেই জেডি ভ্যান্স ও মার্কিন প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি অবকাশকেন্দ্র বুর্গেনস্টকে আলোচনায় যোগ দিতে প্রস্তুত ছিলেন। অন্যদিকে, সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। তবে তারা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আলোচনার আয়োজন করতে সুইজারল্যান্ড এখন প্রস্তুত রয়েছে ও বুর্গেনস্টকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ অব্যাহত আছে। এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এর আগে বুধবার (১৬ জুন) স্বাক্ষরিত ১৪ দফা চুক্তির মাধ্যমে অন্তত আরও ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছিল। এরপর ইরান জানিয়েছিল, তারা কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত। তবে ইরানের আলোচকদের মতে, নতুন আলোচনা শুরুর আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে হবে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, মার্কিন ঘোষণার আগ পর্যন্তও সুইজারল্যান্ডে ইরানি প্রতিনিধিদল যাবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য ছিল না। এর আগে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডে চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হবে। কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। তাদের যুক্তি ছিল, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট এরই মধ্যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, ফলে নতুন কোনো অনুষ্ঠান প্রয়োজন নেই।
চার মাসের যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।এই সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে ও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
শান্তি আলোচনার বাইরে ইসরায়েল
শান্তি আলোচনায় ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে ও একই সঙ্গে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থাও চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ট্রাম্প কি বেশি ছাড় দিয়েছেন?
ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজ দলের কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তুলেছেন, সংঘাত বন্ধ করার জন্য ট্রাম্প ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন কি না। বিশেষ করে, নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে, যখন অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তখন এই সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। উল্লেখ্য, মার্চ মাসে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হবে না। কিন্তু বাস্তবে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরানকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৩০০ বিলিয় বা ৩০ হাজার কোটি ডলারের স্থগিত সম্পদ মুক্ত করে দেওয়ার পাশাপাশি তেল রপ্তানির ওপর তাৎক্ষণিক মার্কিন ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
খামেনির পাল্টা বার্তা
এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প ‘হতাশা থেকে’ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনা সহজ হবে না।
এক বার্তায় তিনি বলেন, মার্কিন পক্ষ যদি অতিরিক্ত দাবি করতে চায়, তাহলে আমরা তা মেনে নেব না। অন্যদিকে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সতর্ক করে বলেছে, ‘অবিশ্বস্ত’ মার্কিন পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করলে তার জবাব দেওয়া হবে। তারা জানিয়েছে, দেশের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো হবে না।
৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক সমঝোতার লক্ষ্য
চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ অবস্থা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। তবে উভয় পক্ষ চাইলে সময়সীমা বাড়ানো যাবে। একই সঙ্গে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন ও অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা হবে। জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপরও সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে চায়।
যুদ্ধের খরচ নিয়ে উদ্বেগ
যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ও এখন আলোচনায় এসেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে যে যুদ্ধের খরচ এবং কিছু অন্যান্য বিল মেটাতে তাদের ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
যুদ্ধে ট্রাম্পের লক্ষ্য পূরণ হয়নি?
প্রায় চার মাস আগে যুদ্ধ শুরু করার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, যাতে দেশটি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। এছাড়া তিনি চেয়েছিলেন, ইরান যেন প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সক্ষমতা হারায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলবিরোধী মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে ও ইরানের জনগণ যেন তাদের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার সুযোগ পায়। কিন্তু সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সময় এসব লক্ষ্যগুলোর একটিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিতে ইরান আবারও তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। যদিও একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। চুক্তির আওতায় ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত দেশের ভেতরেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর তত্ত্বাবধানে নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করতে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্প যে ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি করেছিলেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
সমালোচকদের ভিন্ন মূল্যায়ন
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, আলোচনার মাধ্যমে এখনো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। তাদের লক্ষ্য ২০১৫ সালের চুক্তির চেয়েও কার্যকর একটি সমঝোতা করা। উল্লেখ্য, ওই চুক্তি ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাদের যুক্তি, তেহরান একটি সুপারপাওয়ারের সামরিক আক্রমণ মোকাবিলা করেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছে এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞায় গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ও পেয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে নতুন ফি আরোপের পরিকল্পনা
ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। এছাড়া যুদ্ধের আগে যে ধরনের ফি ছিল না, ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন সেবা ফি আরোপের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে চলমান ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালে এই ফি কার্যকর করা হবে না।
তেলের দাম কমেছে
শুক্রবার (১৯ জুন) তেলের দাম কিছুটা কমেছে। কারণ, পুনরায় চালু হওয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল শুরু হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বাড়ার আশা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত
এদিকে, লেবাননে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, শুক্রবার নতুন ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের দাবি, এসব হামলা হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে চালানো হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধকালীন মিত্র ইসরায়েলকে হামলা বন্ধে বাধ্য করতে ট্রাম্প কতদূর যেতে পারবেন। চুক্তিতে লেবাননের যুদ্ধ ‘স্থায়ীভাবে সমাপ্ত’ করার কথা বলা হলেও ইসরায়েল স্পষ্ট করেছে যে তারা সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা করছে না। বরং নতুন একটি মানচিত্রে তারা সম্প্রসারিত দখল অঞ্চল দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্যগুলোর একটি।
সূত্র: রয়টার্স