গার্দিওলার অশ্রু, একটি যুগের অবসান ভালোবাসা আর বিদায়ের দিন
কিছু বিদায় কেবল একজন কোচের বিদায় নয়, একটি যুগের অবসান। কিছু প্রস্থান ট্রফির চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে স্মৃতি, ভালোবাসা আর ইতিহাসের কারণে। ম্যানচেস্টার সিটির জন্য রবিবার ঠিক তেমনই এক দিন ছিল। এক দশকের জাদুকরী অধ্যায়ের পর ক্লাবটিকে বিদায় জানালেন পেপ গার্দিওলা। আর ইতিহাদ স্টেডিয়াম যেন পরিণত হয়েছিল আবেগ, অশ্রু আর শ্রদ্ধার বিশাল মঞ্চে।
অ্যাস্টন ভিলার কাছে ২-১ গোলে হারের ফল দ্রুতই গুরুত্ব হারায়। কারণ দিনটি ছিল গার্দিওলাকে বিদায় জানানোর। শেষ বাঁশির পরও গ্যালারি ছাড়েননি সমর্থকেরা। “আমাদের আছে গার্দিওলা” স্লোগানে কেঁপে ওঠে ইতিহাদ।
চোখে-মুখে আবেগ নিয়ে গার্দিওলা বলেন, “আমি এখন খুব নার্ভাস। তোমরা আমাকে এত ভালোবাসো কেন? এমনটা কেন করছো? আমি কখনও কল্পনাও করিনি এত ভালোবাসা পাব। ১০ বছর তোমাদের কোচ হতে পারা ছিল অসাধারণ সম্মানের।”
শেষ মৌসুমেও দারুণ লড়াই করেছে সিটি। শেষ দিকে শিরোপা দৌড়ে আর্সেনালের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলেছিল তারা। জিতেছে ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্থার কাপ ও লিগ কাপ। তবু গার্দিওলা জানিয়ে দেন, আরেকটি মৌসুম চালিয়ে নেওয়ার মতো শক্তি তার নেই।
সূর্যালোক ঝলমলে ইতিহাদে নানা শ্রদ্ধার চিত্র দেখা যায়। বিশাল ব্যানারে লেখা ছিল- ‘খেলার ধরন বদলে দেওয়া মানুষ’ ও ‘ইতিহাস নির্মাতা’। তার জন্মভূমির সম্মানে উড়েছে কাতালান পতাকা। বিশেষ স্কার্ফে লেখা ছিল বিদায় ও ধন্যবাদ। এক সমর্থকের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- “১০ বছর আগে তুমি এলে, আমাদের খেলা বদলে দিলে, এখন তুমি চলে যাচ্ছো; সব আর আগের মতো থাকবে না।”
সাইডলাইনে সবসময় প্রাণবন্ত গার্দিওলা এদিন ছিলেন অনেক শান্ত। দুই হাত প্যান্টের পকেটে রেখে দীর্ঘ সময় মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। যেন স্মৃতির ভেতর হারিয়ে গিয়েছিলেন। ২০১৬ সালে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। তখনও তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সিটিতে এসে তিনি যা করেছেন, তা আরও গভীর- একটি ধনী প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে যুগসংজ্ঞায়িত পরাশক্তিতে রূপ দিয়েছেন।
তার বিদায়ের পর বড় পর্দায় দেখানো হয় সেরা মুহূর্তগুলোর ভিডিওচিত্র। গার্দিওলা বলেন, “ভবিষ্যতে পৃথিবীর যেখানেই আমাকে দেখো, যদি সিটির সমর্থক হও, এসে আমাকে জড়িয়ে ধরো। আমার সেটার প্রয়োজন হবে।”
তার সম্মানে ইতিহাদের একটি স্ট্যান্ডের নাম বদলানো হবে। স্টেডিয়ামের বাইরে নির্মাণ করা হবে তার ভাস্কর্যও। ৫৯৩ ম্যাচে সিটির কোচ হিসেবে তিনি এনে দিয়েছেন ২০টি শিরোপা। এর মধ্যে ৬টি প্রিমিয়ার লিগ, যেখানে টানা ৪টি শিরোপা জয়ের ইতিহাসও আছে। রয়েছে ইউরোপসেরা ক্লাব প্রতিযোগিতার শিরোপা।
২০২৩ সালে প্রিমিয়ার লিগ, ইউরোপসেরা ক্লাব প্রতিযোগিতা এবং ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্থার কাপ জিতে দলকে এনে দেন ঐতিহাসিক ত্রিমুকুট।
বিদায়ের দিনটি ছিল আরও আবেগঘন। সিটির অধিনায়ক বের্নার্দো সিলভা ও ডিফেন্ডার জন স্টোনসও খেলেছেন নিজেদের শেষ ম্যাচ। ম্যাচ শুরুর আগেই কন্যা কার্লোতাকে কোলে নিয়ে মাঠে ঢুকে কেঁদে ফেলেন সিলভা। তিনি বলেন, “জীবনে আর কোনো দলকে এভাবে ভালোবাসতে পারব বলে মনে হয় না। এটি শুধু ক্লাব নয়, এটি পরিবার।”
স্টোনসও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, “গত ১০ বছরে তোমাদের ভালোবাসা পাওয়া ছিল স্বপ্নপূরণ। হৃদয়ের গভীর থেকে ধন্যবাদ। এটি সবসময় আমার ঘর হয়ে থাকবে।”
এদিন অ্যাস্টন ভিলার সমর্থকেরাও মজার ছলে গার্দিওলাকে উদ্দেশ করে গেয়েছে- “সকালে তোমার চাকরি যাবে!” যা ইতিহাদের গ্যালারিতেও হাসির ঢেউ তোলে।
এক দশক, অসংখ্য ট্রফি, ইতিহাস, বিপ্লব আর আবেগ- সব মিলিয়ে গার্দিওলার বিদায় কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; এটি ম্যানচেস্টার সিটির সোনালি যুগের শেষ সূর্যাস্ত। তবে কিছু সূর্য অস্ত গেলেও আলো রেখে যায়। গার্দিওলার আলোও ঠিক তেমনই, যা দীর্ঘদিন ফুটবলের আকাশে জ্বলবে।