রবিবার ০৮ নভেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৩শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: November 08, 2026
November 07, 2026
খেলাধুলা
খেলাধুলা

হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির মহাকাব্যে স্বস্তি বাংলাদেশের

Published: November 07, 2026 at 12:18 PM
হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির মহাকাব্যে স্বস্তি বাংলাদেশের

কিছু ইনিংস কেবল রানসংখ্যায় বিচার করা যায় না। কিছু ইনিংস হয়ে ওঠে সমালোচনার জবাব, কিছু ইনিংস বদলে দেয় একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের গতিপথ। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তাওহীদ হৃদয়ের ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংসটি ঠিক তেমনই এক মহাকাব্য। মিরপুরের ব্যর্থতা, সমালোচনার তির আর নিজের সামর্থ্য নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন বাংলাদেশের এই ব্যাটার। ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলক স্পর্শ করেননি, বিপর্যয়ের মুখে থাকা দলকেও এনে দিয়েছেন স্বস্তি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিলেট টেস্টে হৃদয়ের ব্যাটে এসেছে একাধিক রেকর্ড। নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরিতে ডাবল সেঞ্চুরি করার কীর্তিও এখন তাঁর। দেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন হৃদয়। এর আগে এই কীর্তি ছিল মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের।

৩০৪ বল খেলে ১৯ চার ও ৭ ছক্কায় ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছিলেন হৃদয়। শেষ পর্যন্ত ২৪২ রানে অপরাজিত থেকে ইনিংস শেষ করেন তিনি। তবে এই ইনিংসের মাহাত্ম্য কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়। দলের একের পর এক উইকেট পতনের মধ্যেও এক প্রান্ত আগলে রেখে বাংলাদেশের ব্যাটিংকে শক্ত ভিত দিয়েছেন তিনি।

সমালোচনার জবাব ইতিহাস গড়ে

ঢাকা টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ইনিংসেই বাজে শটে আউট হয়ে হতাশ করেছিলেন হৃদয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর আউট হওয়ার ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই পর্যায়ে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিং কেন, তা নিয়ে সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল স্পষ্ট।

সিলেটে হৃদয়ের সামনে তাই ছিল নিজেকে প্রমাণের কঠিন চ্যালেঞ্জ। মুমিনুল হক ছিটকে যাওয়ায় একাদশে সুযোগ পাওয়া এই ব্যাটার সেই সুযোগ কাজে লাগালেন অসাধারণভাবে। যে ক্রিকেটারকে নিয়ে আগের টেস্টে এত আলোচনা, সেই ক্রিকেটারই এবার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আশার নাম।

প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির অপেক্ষা ফুরিয়েছিল তৃতীয় দিন সকালে। জেডেন সিলসের বলে ফাইন লেগে বল ঠেলে রান নিতে গিয়ে প্রথমে লেগ বাইয়ের কারণে শতকের উদযাপন থেমে যায়। তবে পরের ওভারের প্রথম বলেই সিঙ্গল নিয়ে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছে যান হৃদয়। হেলমেট খুলে ব্যাট উঁচিয়ে ধরে উদযাপন করেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।

সেখানেই থামেননি তিনি। শতকের পর দেড় শ, এরপর ডাবল সেঞ্চুরি—প্রতিটি ধাপেই ছিল দায়িত্বশীলতার ছাপ। প্রথম ৫০ রান করতে ১০৯ বল খেললেও পরের ৫০ রান তুলেছেন মাত্র ৬২ বলে। পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিংয়ের গতি বদলেছেন, বাজে বলের শাস্তি দিয়েছেন, আবার প্রয়োজনের সময় দেখিয়েছেন সংযম।

ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার

হৃদয়ের ইনিংসের গুরুত্ব বুঝতে হলে বাংলাদেশের ম্যাচ পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। সাদমান ইসলামের চোটে একজন ব্যাটার কম নিয়ে ইনিংস শুরু করতে হয়েছিল স্বাগতিকদের। ৫১ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ।

চতুর্থ উইকেটে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৭৩ রানের জুটি গড়ে দলকে সাময়িক স্বস্তি দেন হৃদয়। পরে মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে যোগ করেন আরও ৪১ রান। কিন্তু মুশফিক, লিটন কুমার দাস ও মিরাজের বিদায়ে আবারও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারানোর পর দলকে দুই শ পার করানোই কঠিন মনে হচ্ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত ব্যাটারদের ওপর চাপ চেপে বসে। কিন্তু হৃদয় যেন ঠিক করে নিয়েছিলেন, এই ইনিংস সহজে শেষ হতে দেবেন না। এক প্রান্তে উইকেট পড়েছে, অন্য প্রান্তে তিনি দাঁড়িয়ে থেকেছেন পাহাড়ের মতো।

তাইজুল ইসলামকে সঙ্গী করে অষ্টম উইকেটে গড়েছেন অসাধারণ প্রতিরোধ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের হতাশ করে এই জুটি বাংলাদেশকে বিপর্যয় থেকে টেনে তুলেছে। হৃদয়ের ব্যাটে রান এসেছে কখনো দৃষ্টিনন্দন কভারে, কখনো পুলে, আবার কখনো নিখুঁত টাইমিংয়ে বাউন্ডারি পেরিয়ে। আক্রমণ ও সংযমের মিশেলে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বড় ইনিংস খেলতে শুধু শটের বৈচিত্র্য নয়, প্রয়োজন পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাও।

এক ডাবল সেঞ্চুরিতে একাধিক রেকর্ড

হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংস বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। এক ইনিংসেই ভেঙেছেন একাধিক রেকর্ড।

বাংলাদেশের টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান: ২৪২ রানের ইনিংস খেলে মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রানের রেকর্ড ভেঙেছেন হৃদয়। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুরে এই ইনিংস খেলেছিলেন মুশফিক।

চার নম্বরে সর্বোচ্চ ইনিংস: বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে চার নম্বরে ব্যাট করতে নেমে সর্বোচ্চ রান এখন হৃদয়ের। এর আগে ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রামে ১৮১ রান করেছিলেন মুমিনুল হক।

প্রথম সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ রান: বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ রান করার রেকর্ডও এখন হৃদয়ের। মুমিনুল হকের ১৮১ রানের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।

এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কা: ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই ডাবল সেঞ্চুরিতে ১১টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন হৃদয়। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড এটি। এর আগে তামিম ইকবালের ৭ ছক্কা ছিল সর্বোচ্চ।

এক দিনে সর্বোচ্চ রান: টেস্ট ম্যাচের এক দিনে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ রান তোলার রেকর্ডও এখন হৃদয়ের। শনিবার ২১৩ রান করেছেন তিনি। এর আগে ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন টেস্টে এক দিনে ২১২ রান করেছিলেন সাকিব আল হাসান।

সিলেট স্টেডিয়ামে সর্বোচ্চ ইনিংস: সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ডও ভেঙেছেন হৃদয়। এর আগে ২০২৫ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১৭১ রান করেছিলেন মাহমুদুল হাসান জয়।

ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়

হৃদয়ের এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে সুযোগের গল্পও আছে। মুমিনুল হক ছিটকে যাওয়ায় সিলেট টেস্টে একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি। সুযোগটি ছিল নিজেকে প্রমাণের, আগের ভুল শুধরে নেওয়ার। সেই সুযোগকে এমনভাবে কাজে লাগালেন, যা হয়তো নিজেও কল্পনা করেননি। যে টেস্টে তাঁর খেলা নিয়েই ছিল অনিশ্চয়তা, সেই টেস্টই হয়ে উঠল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়।

সবচেয়ে বড় কথা, হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরি বাংলাদেশের জন্যও স্বস্তির উপলক্ষ। যে দল একসময় দুই শ রান করতে পারবে কি না, তা নিয়েই সংশয়ে ছিল, সেই দল এখন শক্ত অবস্থানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে লড়াইয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে এই ইনিংস।

ক্রিকেটে ব্যর্থতা আসবেই। কখনো একটি ভুল শট, কখনো একটি বাজে দিন একজন খেলোয়াড়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কিন্তু বড় ক্রিকেটারদের আলাদা করে চেনা যায় তাঁদের ফিরে আসার ক্ষমতায়। মিরপুরে সমালোচনার মুখে পড়া হৃদয় সিলেটে ফিরেছেন রাজকীয়ভাবে। তাঁর ব্যাটে এবার শুধু রান নয়, ছিল জেদ, আত্মবিশ্বাস আর নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার গল্প।

সিলেটের এই ইনিংস হয়তো হৃদয়ের ক্যারিয়ারের নতুন দরজা খুলে দেবে। সামনে আরও অনেক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির এই দিনটি তিনি মনে রাখবেন আজীবন। বাংলাদেশের ক্রিকেটও মনে রাখবে এমন এক ইনিংস, যেখানে একজন ব্যাটার নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি বিপদের মুখে থাকা দলকে দিয়েছেন বেঁচে থাকার নতুন শক্তি।

মিরপুরে যে হৃদয় প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন, সিলেটে সেই হৃদয়ই হয়ে উঠলেন ইতিহাসের নায়ক!