যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ লাভ চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে বাধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বেইজিংয়ের জন্য এটি একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জ।
এএফপির বেইজিংভিত্তিক প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়েছে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের শুল্কনীতি, তাইওয়ান ইস্যু এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার কৌশলে প্রভাব ফেলতে পারে।
শুল্কনীতিতে ট্রাম্পের ক্ষমতা কমতে পারে
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্পের ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করার সুযোগ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের সময় শুল্ককে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন ট্রাম্প।
সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ডিন উ সিনবো বলেন, শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত হলে চীনের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্পের দর-কষাকষির শক্তি কমে আসবে।
তবে শুল্কনীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদেরও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, শ্রমিক ইউনিয়ন, উৎপাদন খাতের কর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ট্রাম্পের শুল্কনীতি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির ড্রু থম্পসন মনে করেন, আগামী দুই বছরে কংগ্রেস ট্রাম্পের নীতিগুলো বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ কাজে লাগাবে। তবে শুল্ক কমানোর পদক্ষেপে মার্কিন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক ফেলো প্যাট্রিসিয়া কিমের মতে, শুল্কের কারণে মার্কিন ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা সংঘাতের ঝুঁকি বাড়লে চীনের ওপর চাপ বৃদ্ধিতে কংগ্রেসের সমর্থন কমে যেতে পারে।
তাইওয়ান ইস্যুতে বাড়তে পারে উত্তেজনা
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। বেইজিং দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্যদিকে, তাইওয়ানের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিংয়ের মতে, তাইওয়ান ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
ট্রাম্প সম্প্রতি চীনের সঙ্গে আলোচনায় তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রিকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র সরবরাহ প্যাকেজ কয়েক মাসের জন্য স্থগিত করে তাঁর প্রশাসন।
শিয়ারিংয়ের আশঙ্কা, ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছরে চীন তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। বিশেষ করে বেইজিং যদি মনে করে, ওয়াশিংটন অন্য বিষয়ে ব্যস্ত কিংবা তাইওয়ান ইস্যুতে ছাড় দিতে প্রস্তুত।
তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি পুনরায় চালুর জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াতে পারে বলে মনে করেন উ সিনবো। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
এসওএএস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং বলেন, তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের সমর্থন জোরালো হলে বেইজিং দ্বীপটির বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতা কি চীনের সুযোগ?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে চীনের কৌশলে বড় পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্যাট্রিসিয়া কিমের মতে, বেইজিং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে এটিকে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল কৌশল হিসেবে বিবেচনা করতে পারে চীন।
তিনি বলেন, দুই দেশের কেউই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে মৌলিক পরিবর্তন কিংবা বড় ধরনের উন্নতির প্রত্যাশা করছে বলে মনে হয় না।
স্টিভ সাংয়ের মতে, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ট্রাম্পের ওপর চাপ প্রয়োগের সুযোগ হিসেবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলকে কাজে লাগাতে পারে বেইজিং। তবে চীন হিসাব-নিকাশ করে পদক্ষেপ নেবে এবং ট্রাম্পকে এমনভাবে চাপে ফেলতে চাইবে না, যাতে তিনি আরও অনিশ্চিত বা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেন।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সমঝোতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক, সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের নীতিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে তাইওয়ান, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ওয়াশিংটন-বেইজিং উত্তেজনা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আগামী দুই বছরে দুই দেশের সম্পর্ক নির্ভর করবে রাজনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং পারস্পরিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশের ওপর।