একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্ট শুরু করেছিল বাংলাদেশ। জিতলে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে তাদের। খেলাটা ঘরের মাঠ মিরপুরে হওয়ায় নাজমুল বাহিনীর আত্মবিশ^াসের গ্রাফটাও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তাদের সে স্বপ্নপূরণ করতে তিন বিভাগেই নিজেদের সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিতে হতো। ২২ গজের ময়দানে টাইগাররা কি সেটা দেখাতে পেরেছেন? বিশেষ করে ব্যাটসম্যানরা? আবার বোলিং আক্রমণে নিজেদের শক্তির দিক বিবেচনায় রেখে উইকেট তৈরি করা হয়েছিল কি? মিরপুর টেস্টে চতুর্থ দিনে গতকাল বাংলাদেশের শোচনীয় পরাজয়ের পর এমন অনেক প্রশ্নই ডালপালা মেলেছে এখন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ঘরের মাঠের সুবিধা কতটুকু কাজে লাগাতে পেরেছে বাংলাদেশ? মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামকে বলা হয় বাঘের ডেরা। সেখানে অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকেই নাকানিচুবানি খাইয়েছে বাংলাদেশ। অথচ সে মাঠেই কিনা স্বাগতিকদের পারফরম্যান্স ছিল নখদন্তহীন, নির্বিষ। রোস্টন চেজের ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে রীতিমতো অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে তাদের। ৮ উইকেটে হারের তেতো স্বাদ পেতে হয়েছে টাইগারদের। মিরপুরের পিচে চতুর্থ দিনে ১৬৯ রান তাড়া করে অনায়াসে, হেসেখেলে জয় তুলে নিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ; তাও কিনা ৩৫.১ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে। এ হারে বাংলাদেশের ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলার স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। একইসঙ্গে চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে চার নম্বর থেকে এখন পাঁচে বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্ত হতাশা লুকাননি। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘সত্যি বলতে এটি (ফাইনাল খেলা) এখন খুব কঠিন। এই ম্যাচে আমরা নিজেদের সেরাটা খেলতে পারিনি।’
তৃতীয় দিনশেষে নাঈম হাসান সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তারা ২০০ রানের লক্ষ্য দিতে চান। চতুর্থ দিনে তা আর হলো কই? এদিন ৬ উইকেটে ৭৯ রানে দ্বিতীয় ইনিংসে মাঠে নামে বাংলাদেশ। উইকেটে ছিলেন দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান- জাকের আলি (১৮) ও নাঈম হাসান (১৮)। তবে আগের দিন ব্যাটিং বিপর্যয় সামলে এই জুটি যেভাবে দলের হাল ধরেছিলেন, ক্যারিবীয় বোলারদের বিপক্ষে লড়াই করেছিলেন- চতুর্থ দিনে সে ছন্দ আর ধরে রাখতে পারেননি। জাকেরের উইকেট হারানো দিয়ে দিনের শুরু। এদিন নিজের স্কোরের পাশে আর মাত্র ৪ রান যোগ করতে পারেন তিনি। ব্যক্তিগত ২২ রানে আউট হয়েছেন জাকের। তবে উইকেটের একপাশ আগলে রেখে একাই দলকে টেনেছেন নাঈম। ২৬ ম্যাচের ক্যারিয়ারে প্রথমবার ফিফটির স্বাদ পেয়েছেন তিনি। ৯১ বলে ৪টি চারের সাহায্যে ৫২ রানের ইনিংস খেলেছেন। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে নাঈম আউট হওয়ার সময় বাংলাদেশের দলীয় সংগ্রহ তখন ৪৮.৪ ওভারে ১৪২। শুরুতে ওয়ারিক্যান, শেষে নাঈমের উইকেট তুলে নেন চেজ। মাঝে হাসান মাহমুদ ও তাইজুল ইসলামের উইকেট শিকার করেন তারাই। অর্থাৎ চতুর্থ দিনে বাংলাদেশের চার উইকেটের মধ্যে সমান দুটি করে নিয়েছেন ওয়ারিক্যান ও চেজ। এদিন স্কোরকার্ডে আর মাত্র ৬৩ রান যোগ করতে পারে বাংলাদেশের ব্যাটাররা। প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছিলেন ওয়ারিক্যান। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়েছেন ক্যারিবীয় বাঁহাতি স্পিনার। অফস্পিনিং অলরাউন্ডার চেজের শিকার ৫টি। প্রথম ইনিংসে ২৭ রানে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪২ রান করতে পারে তারা। এতে ক্যারিবীয়দের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৭০ রান। বৃষ্টি বাধায় খেলা কিছুটা সময় বন্ধ থাকলেও চতুর্থ দিনে এই লক্ষ্যটা টপকাতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি সফরকারীদের। ওয়ানডে মেজাজে ব্যাটিং করে ৩৫.১ ওভারে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলেন তারা। উদ্বোধনী জুটিতেই ১১২ রান জমা করেন ব্রেন্ডন কিং ও জন ক্যাম্পবেল জুটি। ৪৯ রানে ক্যাম্পবেলকে শরিফুল আউট করেন। মাঝে ত্যাগনারায়ণ চন্দরপল (১) ফিরলেও কাভেম হজকে নিয়ে তৃতীয় উইকেটে ৫১ বলে অবিচ্ছিন্ন ৫০ রানের জুটি গড়ে দলকে জয়ী করে মাঠ ছাড়েন কিং। ১১৫ বলে ৮১ রানে অপরাজিত ছিলেন ক্যারিবীয় ওপেনার। হজ ২৭ বলে ৩১*।
এক সময় মিরপুরের উইকেটে বাংলাদেশের স্পিনাররা রাজত্ব করেছেন। সেদিক বিবেচনায় রেখে উইকেটও স্পিনবান্ধব করা হয়েছে। স্পিনারদের সোনালি দিন এখন অনেকটাই অতীত। বর্তমানে বাংলাদেশের বোলিং বিভাগে রাজত্ব করছেন পেসাররা। একঝাঁক আন্তর্জাতিক মানের পেস বোলার আছেন। এ বছর টেস্টে যতটুকু সাফল্য, তার বেশিরভাগই পেসারদের হাত ধরে। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে বোলিং আক্রমণে সেই পেসারদের ওপরই আস্থা রাখতে পারেনি টিম ম্যানেজমেন্ট। এজন্যই উইকেট বানিয়েছে স্পিননির্ভর। এতে হীতে বিপরীত হয়েছে। নিজেদের ফাঁদে নিজেরাই আটকা পড়েছেন। বাংলাদেশ একাদশ সাজিয়েছে দুই পেসার হাসান ও শরিফুল এবং তিন স্পিনার মিরাজ (স্পিনিং অলরাউন্ডার), নাঈম ও তাইজুলকে নিয়ে। প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২৪৫ রানে গুটিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন নাঈম (৪), তাইজুল (২) ও মিরাজ (২)। এই তিন স্পিনার মিলে উইকেট নিয়েছেন ৮টি। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের স্পিনাররা ছিলেন নিষ্প্রভ। তিনজন মিলে ২৮.১ ওভার বোলিং করলেও কোনো উইকেট পাননি। দুই পেসার শরিফুল ও হাসান সমানসংখ্যক একটি করে উইকেট নিয়েছেন। আবার প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশকে ২৭২ রানে অলআউট করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। যেখানে দুই স্পিনার ওয়ারিক্যান (৫) ও বিশপ (২) মিলে নিয়েছেন ৭ উইকেট। এরপর বাংলাদেশকে দ্বিতীয় ইনিংসে তারা ১৪২ রানে অলআউট করেছে। এর মধ্যে ৯ উইকেটই নিয়েছেন দুই স্পিনার ওয়ারিক্যান (৪) ও চেজ (৫)। দুই ইনিংস মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা নিয়েছেন ১৬ উইকেট; বাংলাদেশ নিতে পেরেছে ৮টি। নাজমুল বলেন, ‘অতীতে স্পিনাররাই আমাদের অনেক ম্যাচ জিতিয়েছেন। তাই তাদের ওপর সেই আস্থাটা আগে যেমন ছিল, এখনও আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবার সেটা কাজে আসেনি। তবে আমার মনে হয় না, কন্ডিশন তৈরির ক্ষেত্রে আমরা খুব বেশি ভুল করেছি।’
সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিভাগ। প্রথম ইনিংসে একমাত্র উজ্জ্বল ছিলেন সাদমান। তিনি সেঞ্চুরি করেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪২ রান তাওহিদের। দ্বিতীয় ইনিংসে আরও বিবর্ণ ছিলেন ব্যাটসম্যানরা। বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানরা যেন ব্যাটিং করাটাই ভুলে গিয়েছিলেন। উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার মিছিলে সবাই শামিল হয়েছিলেন। এতে ৫৩ রানের মধ্যে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। সেখান থেকে জাকের ও নাঈমের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলীয় সংগ্রহটা দেড়শ’র কাছাকাছি যায়। সর্বোচ্চ ৫২ রান নাঈমের। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটসম্যানরা প্রতিপক্ষ বোলারকে এভাবে উইকেট উপহার না দিলে, তাদের দলীয় স্কোর আরও বড় হতো। ২৫০ বা ৩০০ হলে ফলাফল অন্যরকমও হতে পারত! আবার তৃতীয় ও চতুর্থ দিনে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিভাগ হুড়মুড়িয়ে পড়েছে ক্যারিবীয় স্পিনারদের সামনে। অথচ ১৬৯ রান তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিনে সাবলীল ব্যাটিং করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা। বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণ ছিল একদম নির্বিষ।