বিচারবিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থার ক্রমাগত হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন পাকিস্তানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিচারপতি মহসিন কিয়ানি। বিবেকের দংশন এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার দোহাই দিয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আগেই তিনি তার পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন। এর মধ্য দিয়ে সে দেশের বিতর্কিত ২৬তম ও ২৭তম সংবিধান সংশোধনের জের ধরে পদত্যাগকারী চতুর্থ বিচারক হিসেবে যুক্ত হলেন লাহোর হাইকোর্টের এই সাবেক বিচারক।
বুধবার পদত্যাগপত্রে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিচারব্যবস্থায় সশস্ত্র বাহিনীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের তীব্র সমালোচনা করেন মহসিন কিয়ানি। তিনি উল্লেখ করেন, বিচারকদের নিয়োগ ও বদলিসহ বিচারিক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। যার ফলে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং স্বাধীন বিচারে সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। তিনি জানান, বিচারব্যবস্থা মূলত সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও এই পরিস্থিতিতে তাদের চাহিদা ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। এই অবস্থায় নিজের বিবেক আর তাকে বিচারকের আসনে বহাল থাকতে দিচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি জানান, তিনি আবার আইন পেশায় ফিরে যাবেন এবং জনগণের অধিকার রক্ষা ও আইনি সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে আত্মনিয়োগ করবেন।
মহসিন কিয়ানির এই পদত্যাগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে গত বছরের নভেম্বরে বিতর্কিত সংবিধান সংশোধনের প্রতিবাদে একই রকম কারণ দর্শিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি সৈয়দ মনসুর আলী শাহ ও আতহার মিনাল্লাহ এবং লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি শামস মেহমুদ মির্জা। মূলত ২০২৪ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে বিচারবিভাগে সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে যে ছয়জন বিচারক চিঠি দিয়েছিলেন, মহসিন কিয়ানি ছিলেন তাদের অন্যতম। সেই চিঠিতে তারা গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি, পরিবারের সদস্যদের অপহরণ ও নির্যাতন এবং বিচারকদের বাসভবনে নজরদারি চালানোর মতো বিস্ফোরক সব তথ্য তুলে ধরেছিলেন।
বিচারপতি কিয়ানির বিচারিক ক্যারিয়ারে সম্প্রতি বেশ কিছু প্রশাসনিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের সিনিয়র পুইনে জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কিয়ানি ছিলেন উক্ত আদালতের পরবর্তী প্রধান বিচারপতি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে। তবে চলতি বছরের এপ্রিলে তাকে হুট করেই স্থানান্তরিত করে লাহোর হাইকোর্টে পাঠানো হয়, যেখানে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তার অবস্থান ১২ নম্বরে নেমে যায়। একই সময়ে লাহোর হাইকোর্ট থেকে বিচারপতি সরফরাজ ডোগারকে এনে প্রধান বিচারপতি হিসেবে বসানো হয় ইসলামাবাদ হাইকোর্টে। এই আন্তঃহাইকোর্ট বদলিকে চ্যালেঞ্জ করে কিয়ানি সহ অন্যান্য বিচারকেরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেও সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বেঞ্চ সেই বদলির সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন।
পরবর্তীতে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের প্রশাসনিক ক্ষমতা একক নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নির্দিষ্ট বিচারকদের মামলা পরিচালনা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে পুনরায় সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন তিনি। লাহোর হাইকোর্টে থাকাকালীন তাকে কোনো বিভাগীয় বেঞ্চে রাখা হয়নি এবং পদত্যাগের মাত্র কয়েক দিন আগে তাকে কাঙ্ক্ষিত পদের বদলে রাওয়ালপিন্ডি রেজিস্ট্রি বেঞ্চে একক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। জোরপূর্বক গুমের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার থাকা কিয়ানি পূর্বে ইসলামাবাদ ডিস্ট্রিক্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পাকিস্তানের বিচারবিভাগের বর্তমান এই চরম সংকটের মূলে রয়েছে বিতর্কিত দুটি সংবিধান সংশোধন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পাস হওয়া ২৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টগুলোর বেশ কিছু ক্ষমতা খর্ব করা হয়, শেষ করা হয় আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ এবং জ্যেষ্ঠতার নিয়ম বাতিল করে প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়। তৎকালীন সামরিক জান্তা এবং সরকার যৌথভাবে একটি স্বতন্ত্র ‘ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট’ গঠন করতে চেয়েছিল, যা সাধারণ বিচারব্যবস্থা ও সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থাকে পৃথক করে ফেলবে। প্রথমে তা আটকে গেলেও পরবর্তীতে পাস হওয়া ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে তা কার্যকর করা হয়। এর ফলে পাকিস্তানে বর্তমানে দুটি সমান্তরাল সর্বোচ্চ আদালত বিদ্যমান এবং উভয় আদালতেরই আলাদা প্রধান বিচারপতি রয়েছেন।