দাবানলের ধোঁয়ার সংস্পর্শে শিশুদের অটিজমের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় বলে এক সাম্প্রতিক গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গর্ভকালীন সময়ে, বিশেষ করে গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে দাবানলের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে শিশুদের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত প্রায় নয় লক্ষ মা ও শিশুর ওপর পরিচালিত একটি বিস্তৃত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা এই আশঙ্কাজনক তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানান, গর্ভধারণের পুরো সময়জুড়ে ধোঁয়াজনিত অতি সূক্ষ্ম কণার গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে মাত্র ০.৭৫ মাইক্রোগ্রাম বৃদ্ধি পেলেই শিশুর অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি শতকরা ৩০ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, মানব ভ্রূণের মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে গর্ভাবস্থাতেই। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্নায়ুকোষের মধ্যকার যোগাযোগ বা স্ন্যাপটিক সংযোগগুলো গঠন হতে শুরু করে। এ সময় যেকোনো ক্ষতিকর পরিবেশগত উপাদানের তীব্র প্রভাব স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ও স্নায়বিক প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তার সূত্রে আরও জানা যায়, দাবানলের ধোঁয়া কেবল সাধারণ কোনো বাতাস নয়; এতে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা ছাড়াও থাকে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ। স্থান ও জ্বালানির ধরনের ওপর নির্ভর করে এই ধোঁয়ার উপাদান পরিবর্তিত হতে পারে। যখন কোনো এলাকার আবাসিক ভবন, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, পেন্ট কিংবা অন্যান্য বিষাক্ত দ্রব্যাদি আগুনে পুড়ে ছাই হয়, তখন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানগুলো বাতাসের সূক্ষ্ম কণার সাথে মিশে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে প্রবেশের পর এই অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো শরীরের গভীর অংশে পৌঁছে যায় এবং পুরো দেহে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সৃষ্টি করে। এটিই সম্ভবত সেই পথ, যার মাধ্যমে ধোঁয়ার প্রতিক্রিয়া গর্ভের সন্তান ও তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কোনো এলাকায় আগুন জ্বললে তার থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া মূল স্থান পেরিয়ে বহুদূর পরিভ্রমণ করতে পারে। ফলে দৃশ্যমান ধোঁয়া না থাকলেও মানুষ বিষাক্ত বাতাসের কবলে পড়তে পারে।
অবশ্য মূল গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক সমীক্ষা হওয়ায় এতে এখনই সরাসরি কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তবুও বংশগত প্রভাব বা জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাবগুলো কীভাবে অটিজমে ভূমিকা রাখে, তা স্পষ্ট করার জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সার্বিক ঝুঁকি কমাতে গর্ভাবস্থায় বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা, দ্রুত পূর্বাভাস দেওয়া এবং ইনডোর এয়ার কোয়ালিটি বা বাসার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ধোঁয়ামুক্ত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।