‘চলুন, এক কাপ কফি খাই’...স্টার্টআপ দুনিয়ায় এই ছোট্ট আমন্ত্রণের অর্থ অনেক সময় শুধু কফি খাওয়া নয়। হতে পারে নতুন একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর সঙ্গে পরিচয়, দলের সদস্যদের সঙ্গে ভাবনা বিনিময় কিংবা ভবিষ্যতের কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগের প্রথম আলাপ। তাই প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তাবিশ্বে কফি যেন হয়ে উঠেছে সৃজনশীলতা, যোগাযোগ ও নতুন সম্ভাবনার এক অনানুষ্ঠানিক সঙ্গী। কফির সঙ্গে ব্যবসায়িক আলাপের এই সংস্কৃতি অবশ্য নতুন নয়। ইউরোপের পুরোনো কফিহাউসগুলো একসময় ব্যবসায়ী, লেখক, গবেষক ও চিন্তাশীল মানুষের মিলনস্থল ছিল। লন্ডনের কিছু ঐতিহাসিক কফিহাউসকে ঘিরে ব্যবসায়িক লেনদেন ও নতুন প্রতিষ্ঠানের ধারণা গড়ে ওঠার নজিরও রয়েছে। সে সময় এক কাপ কফির টেবিলেই চলত আলোচনা, মতবিনিময় ও নতুন যোগাযোগ।
আজকের স্টার্টআপ দুনিয়ায় সেই সংস্কৃতিই যেন নতুন রূপ পেয়েছে। ঘরের বাইরে কাজের জন্য ক্যাফে এখন অনেক উদ্যোক্তার পছন্দের জায়গা। আরাম করে বসে ল্যাপটপ খোলা, পাশে কফির কাপ, সামনে নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা, এমন দৃশ্য এখন বিশ্বের বড় শহরগুলোর পরিচিত ছবি। বাড়ি ও অফিসের বাইরে এমন জায়গাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘থার্ড প্লেস’ বলা হয়, যেখানে মানুষ স্বাভাবিক পরিবেশে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কফির জনপ্রিয়তার পেছনে এর স্বাদ ও সামাজিক আবহের পাশাপাশি ক্যাফেইনের ভূমিকাও রয়েছে। ক্যাফেইন মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে, ফলে সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়তে পারে। স্টার্টআপের মতো চিন্তা, পরিকল্পনা ও দ্রুত সিদ্ধান্তনির্ভর কাজে তাই অনেক উদ্যোক্তার দৈনন্দিন রুটিনে কফি জায়গা করে নিয়েছে।
গবেষণাতেও কফি ও উদ্যোক্তা পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের একটি এনবিইআর গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন স্টারবাকস চালু হওয়া এলাকায় বছরে নতুন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণাটি কফিই যে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির কারণ, এমন সিদ্ধান্ত দেয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক ধারণা বিনিময়ের জায়গা হিসেবে ক্যাফের ভূমিকার প্রতি এটি নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কফির টেবিলে শুধু ব্যবসার কথাই হয় না। একজন উদ্যোক্তা অন্য উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতা শুনতে পারেন, বিনিয়োগকারীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, নতুন সহকর্মীর সঙ্গে পরিকল্পনা ভাগ করে নিতে পারেন। অনেক সময় আনুষ্ঠানিক বৈঠকের চেয়ে এমন স্বাভাবিক আলাপেই নতুন ধারণার দরজা খুলে যায়।।
বাংলাদেশেও বাড়ছে কফিকে ঘিরে উদ্যোক্তা সংস্কৃতি
বাংলাদেশের স্টার্টআপ দুনিয়াতেও কফি ধীরে ধীরে কাজ ও যোগাযোগের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠছে। ঢাকার বিভিন্ন ক্যাফেতে উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিকর্মী ও তরুণ পেশাজীবীদের ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। স্টার্টআপ সম্মেলন, উদ্যোক্তা আড্ডা ও নেটওয়ার্কিং আয়োজনেও ক্যাফের মতো অনানুষ্ঠানিক জায়গার ব্যবহার বাড়ছে। ফলে কফি এখানে শুধু পানীয় নয়, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, ধারণা ভাগাভাগি করা এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার আলাপ শুরুর একটি সহজ মাধ্যম হয়ে উঠছে।
শেষ পর্যন্ত স্টার্টআপ তৈরি করে মানুষের ধারণা, পরিশ্রম ও উদ্যোগ। কফি সেই যাত্রার চালক নয়, বরং অনেক সময় পাশে থাকা এক পরিচিত সঙ্গী। এক কাপ কফির টেবিলে হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় না, কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়, নতুন একটি ভাবনা কিংবা ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। আর এ কারণেই স্টার্টআপ দুনিয়ায় কফির কাপটি দিন দিন আরও বেশি অর্থবহ হয়ে উঠছে।