একসময় সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপ হাতে নেওয়াই ছিল বাঙালির পরিচিত অভ্যাস। অতিথি আপ্যায়ন থেকে বন্ধুদের আড্ডা, অফিসের বিরতি থেকে পাড়ার টং, সবখানেই চায়ের ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। সেই চেনা চিত্র এখন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চায়ের পাশাপাশি জায়গা করে নিচ্ছে কফি। শহরের ক্যাফে থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার দোকান, এমনকি অনেক সাধারণ চায়ের দোকানেও এখন মিলছে নানা ধরনের কফি। কফি পানের এই পরিবর্তন শুধু শহুরে জীবনযাত্রায় সীমাবদ্ধ নেই। নতুন প্রজন্মের কাছে কফি এখন আড্ডা, কাজ, পড়াশোনা কিংবা অবসর কাটানোর সঙ্গী। ল্যাপটপ খুলে ক্যাফেতে বসে কাজ করা শিক্ষার্থী বা তরুণ পেশাজীবীদের দৃশ্যও এখন বেশ পরিচিত। আবার কম দামের ইনস্ট্যান্ট কফির কারণে ক্যাফের বাইরে ঘরেও সহজে তৈরি করা যাচ্ছে পছন্দের পানীয়টি।
অভ্যাস বদলের সঙ্গে বাড়ছে বাজার
দেশে কফির চাহিদা কতটা বাড়ছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় আমদানির পরিসংখ্যানে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে দেশে কফি আমদানি হয়েছিল ১৩৯ টন। ২০১২ সালে তা বেড়ে হয় ২৬৪ টন। আর ২০২৫ সালে একক বছরেই দেশে কফি আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৭৪৫ টন। অর্থাৎ এক দশকের বেশি সময়ে কফির বাজারে এসেছে বড় পরিবর্তন। ডিএইর পর্যালোচনা অনুযায়ী, গত এক দশকে কফির বাজার বৃদ্ধির হার ছিল গড়ে ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে চায়ের বাজার বেড়েছে গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ হারে। বিশ্ববাজারে কফির দামের ওঠানামা কিংবা আমদানি পর্যায়ে শুল্ক পরিবর্তনের কারণে কোনো কোনো বছর আমদানিতে সাময়িক কমবেশি হলেও দেশের ভোক্তা পর্যায়ে কফির চাহিদা বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট।
ক্যাফের বাইরে কফি
কফির জনপ্রিয়তার বড় একটি পরিবর্তন এসেছে এর সহজলভ্যতায়। একসময় কফি বলতে অনেকের কাছে দামি ক্যাফে কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের কথা মনে হতো। এখন সেই ধারণা বদলেছে। ছোট স্যাশের ইনস্ট্যান্ট কফি থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্যাফের বিভিন্ন ধরনের কফি সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ৩-ইন-১ কফির ছোট প্যাকেট কফিকে আরও সহজলভ্য করেছে। গরম পানিতে মিশিয়ে কয়েক মিনিটেই তৈরি করা যায় বলে ব্যস্ত কর্মজীবী মানুষ থেকে শিক্ষার্থী, অনেকের কাছেই এটি সুবিধাজনক বিকল্প হয়ে উঠেছে। ফলে কফি এখন শুধু বিশেষ কোনো সময়ের পানীয় নয়, দিনের বিভিন্ন সময়ের সঙ্গী হয়ে উঠছে। এই স্যাশেনির্ভর কফির প্রসার এবং কফিকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আবুল খায়ের গ্রুপের ‘আমা কফি’।
আড্ডা থেকে কর্মক্ষেত্র
কফির জনপ্রিয়তার সঙ্গে বদলেছে এর ব্যবহারও। ক্যাফেতে এখন শুধু গল্প করার জন্য মানুষ বসেন না। কেউ অফিসের কাজ করছেন, কেউ পড়াশোনা করছেন, কেউ অনলাইন বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। ফ্রিল্যান্সার ও দূরবর্তীভাবে কাজ করা পেশাজীবীদের জন্য অনেক ক্যাফে হয়ে উঠেছে সাময়িক কর্মস্থল। বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণদের বিভিন্ন আয়োজনেও কফির উপস্থিতি বাড়ছে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা ক্যাম্পাসের আড্ডা, সবখানেই কফি এখন পরিচিত অনুষঙ্গ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যাফে সংস্কৃতির বিস্তারও তরুণদের মধ্যে কফির প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
পাহাড়ে বাড়ছে দেশীয় উৎপাদন
কফির জনপ্রিয়তা বাড়ার পাশাপাশি দেশে উৎপাদনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলেই কফি চাষের শুরুটা বেশি দৃশ্যমান হলেও এখন তা শুধু পার্বত্য এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। পার্বত্য তিন জেলার পাশাপাশি টাঙ্গাইল, রংপুর ও নীলফামারীতেও বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ শুরু হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উল্লেখ করে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকেরাও কফি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বাজারে চাহিদা থাকায় এটি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সম্ভাবনা তৈরি করছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে একদিকে স্থানীয় কৃষক লাভবান হতে পারেন, অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতার ওপরও কিছুটা চাপ কমতে পারে। দেশীয় কফিকে ঘিরে উদ্যোক্তাদের আগ্রহও বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পাহাড়ি কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছে, কফি চাষে সহায়তা দিচ্ছে এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কফিকে বাজারে পরিচিত করার চেষ্টা করছে।
চায়ের সঙ্গে সহাবস্থান
কফির জনপ্রিয়তা বাড়লেও এর অর্থ এই নয় যে চায়ের জায়গা পুরোপুরি দখল করে নিচ্ছে কফি। বরং বাংলাদেশের পানীয় সংস্কৃতিতে দুটির জন্যই আলাদা জায়গা তৈরি হচ্ছে। কেউ সকালে চা দিয়ে দিন শুরু করছেন, আবার বিকেলের আড্ডায় বেছে নিচ্ছেন কফি। কেউ চায়ের পাশাপাশি কফিও রাখছেন নিজের নিয়মিত পছন্দের তালিকায়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পানীয় সংস্কৃতিতে কফির অবস্থান এখন আর শুধু শহুরে ক্যাফের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সহজলভ্যতা, নতুন প্রজন্মের জীবনযাপন, ক্যাফে সংস্কৃতি এবং দেশীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা মিলিয়ে কফি ধীরে ধীরে পৌঁছে যাচ্ছে আরও বেশি মানুষের কাছে। একসময় যে পানীয়কে অনেকেই বিশেষ উপলক্ষের অংশ মনে করতেন, সেটিই এখন হয়ে উঠছে প্রতিদিনের পরিচিত সঙ্গী। চায়ের দেশে তাই কফির গল্পটি এখন আর নতুন নয়, বরং বদলে যাওয়া জীবনযাপনেরই একটি দৃশ্যমান অংশ।