অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার জাদুঘর থেকে ৪০ লাখ ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা) বেশি মূল্যের হীরাখচিত একটি হার চুরি করেছে দুই ব্যক্তি।বৃহস্পতিবার দিনের আলোয় দর্শনার্থীর ছদ্মবেশে জাদুঘরে ঢুকে হাতুড়ি দিয়ে কাচের প্রদর্শনী বাক্স ভেঙে হারটি নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। অস্ট্রিয়ার পুলিশ জানিয়েছে, চুরির ঘটনায় জড়িত দুই সন্দেহভাজনের সন্ধানে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে। তাদের ছবি প্রকাশ করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে ঢোকার আগে তাদের দেখা গেছে। চুরি হওয়া হারটি ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লায়েড আর্টস (এমএকে)-এ আয়োজিত একটি গয়নার প্রদর্শনীতে রাখা ছিল। হারটি প্লাটিনামের তৈরি এবং এতে বসানো ছিল মোট ৬৭৩টি হীরা। একসময় এটি মিসরের রাজপরিবারের মালিকানাধীন ছিল। পুলিশের ধারণা, চুরির পর দুই ব্যক্তি পায়ে হেঁটে পাশের একটি পার্কের দিকে পালিয়ে যায়। ঘটনায় কেউ আহত হয়নি। তবে সন্দেহভাজনদের একজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
অস্ট্রিয়ার পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজনদের ধরতে ‘ব্যাপক অনুসন্ধান অভিযান’ চলছে। এতে প্রশিক্ষিত কুকুরের ইউনিটও ব্যবহার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল জানিয়েছে, চুরি হওয়া হারটিকে তাদের চুরি যাওয়া শিল্পকর্মের ডেটাবেসে অন্তর্ভুক্ত করেছে অস্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। ঘটনার পর বৃহস্পতিবার কিছু সময়ের জন্য প্রদর্শনীটি বন্ধ রাখা হয়। পরে একই দিন সেটি আবার খুলে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত কাচের প্রদর্শনী বাক্সটি ঢাকতে সেখানে একটি নীল প্যানেল বসানো হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরে প্রদর্শনী এলাকায় মেটাল ডিটেক্টরও বসানো হয়েছে। প্রদর্শনীটি আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।
চুরি যাওয়া হারটি ফরাসি বিলাসবহুল গয়না নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলসের তৈরি। ১৯৩০-এর দশকে মিসরের রানি নাজলির জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল।
মিউজিয়ামের নিজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলসের ৩০০টিরও বেশি নকশার গয়না নিয়ে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনীতে হারটি রাখা হয়েছিল।
হারটিতে ব্যবহৃত হীরাগুলোর মোট ওজন ২০০ ক্যারেটের বেশি। এর মাঝখানে রয়েছে ছয় ক্যারেট ওজনের একটি বড় হীরা। সেটিকে ঘিরে রয়েছে সারিবদ্ধ ব্যাগেট কাটের হীরা এবং আরও শত শত ছোট হীরা। সবগুলো হীরা সূর্যরশ্মির মতো নকশায় সাজানো। ১৯৩৯ সালে মিসরের রাজা প্রথম ফুয়াদের স্ত্রী রানি নাজলি তাদের মেয়ে ফাওজিয়ার বিয়ের জন্য একটি হারের পাশাপাশি এর সঙ্গে মানানসই একটি টিয়ারাও তৈরি করিয়েছিলেন।
রাজপরিবার থেকে নিলামে
১৯৫০ সালে রানি নাজলি ও তার আরেক মেয়ে ফাথিয়াকে রাজকীয় উপাধি থেকে বঞ্চিত করেন নাজলির ছেলে এবং রাজা ফুয়াদের উত্তরসূরি ফারুক প্রথম। ফাথিয়া একজন কপটিক খ্রিস্টান কূটনীতিক ও সাধারণ পরিবারের সদস্যকে বিয়ে করায় রাজা ফারুক এতে ক্ষুব্ধ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে নাজলি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষদিকে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় তিনি হার ও টিয়ারাটি বিক্রি করে দেন। হারটি ২০১৫ সালে আবার প্রকাশ্যে আসে। ওই বছর সোথবির নিলামে এটি প্রায় ৪৩ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। নিলাম প্রতিষ্ঠানের ক্যাটালগে গয়নাটির কারুকাজকে ‘অসাধারণ দক্ষতার নিদর্শন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। হীরাগুলোর বিন্যাসের কারণে এত বড় ও ভারী গয়নাটিও পরতে ‘আশ্চর্যজনকভাবে আরামদায়ক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ফাওজিয়া ফারুকের দুঃখ প্রকাশ
চুরির ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন রানি নাজলির প্রপৌত্রী ফাওজিয়া ফারুক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি হারটিকে তাদের পরিবারের ইতিহাস ও মিসরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ‘অপরিবর্তনীয় অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এটি এমন এক সময়ের মূল্যবান স্মারক, যা সৌন্দর্য, শিল্পকুশলতা ও দূরদর্শিতার সাক্ষ্য বহন করে এবং যার গুরুত্ব ব্যক্তিগত স্বার্থের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। জাদুঘরটির মহাপরিচালক লিলি হলাইন বলেন, চুরির ঘটনা তাদের ‘গভীরভাবে আঘাত করেছে’। ইউরোপের বিভিন্ন বড় জাদুঘরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটায় নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ইউরোপের জাদুঘরে ধারাবাহিক দুর্ধর্ষ চুরি
ভিয়েনার এই চুরি ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘরে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক ‘স্ম্যাশ-অ্যান্ড-গ্র্যাব’ চুরির সর্বশেষ ঘটনা। গত বছরের অক্টোবরে ফ্রান্সের প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরে জানালা ভেঙে ঢুকে নেপোলিয়ন আমলের অমূল্য কিছু নিদর্শন নিয়ে পালিয়ে যায় চোরেরা। ঘটনাটি পরে ‘শতাব্দীর দুর্ধর্ষ চুরি’ হিসেবে আলোচিত হয়। এর আগে একই বছর নেদারল্যান্ডসের একটি জাদুঘরে বিস্ফোরক ব্যবহার করে ঢুকে চারটি প্রাচীন নিদর্শন চুরি করা হয়। এর মধ্যে রোমানিয়ার কাছ থেকে ধার নেওয়া প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো একটি সোনার হেলমেটও ছিল। ভিয়েনার চুরির দিনই স্পেনের আলিকান্তের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরেও চুরির ঘটনা ঘটে। সেখানে ‘ট্রেজার অব ভিয়েনা’ নামে পরিচিত ব্রোঞ্জ যুগের সংগ্রহ থেকে বেশ কিছু স্বর্ণ ও রুপার নিদর্শন নিয়ে যায় চোরেরা। স্পেনের সংবাদমাধ্যম এল পাইস জানিয়েছে, ভোরের ওই চুরিটি মাত্র চার মিনিটেরও কম সময়ে সম্পন্ন করে দুষ্কৃতকারীরা।
জাদুঘর চুরিতে বাড়ছে সহিংসতা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরোপোল জানিয়েছে, ইউরোপে জাদুঘর থেকে চুরির ঘটনা ক্রমেই আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি মূল্যবান ধাতু, রত্ন ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের উপাদানে তৈরি নিদর্শন চুরির ক্ষেত্রে ‘সহিংস ও জোরপূর্বক কৌশলের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি’ লক্ষ্য করার কথা জানিয়েছে। ইউরোপোলের মতে, নতুন ধরনের অপরাধী এবং অন্যান্য অপরাধজগতের সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিরাও জাদুঘর চুরির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। কারণ তাদের কাছে এ ধরনের অপরাধ তুলনামূলকভাবে ‘কম ঝুঁকির, বেশি লাভের’ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে অমূল্য শিল্পকর্ম ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভিয়েনার সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই উদ্বেগকেই আরও জোরালো করেছে।