বিশ্বজুড়ে সম্পদশালী ব্যক্তিদের সংখ্যা ও বিন্যাস নিয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ গবেষণায় উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু সংযুক্ত আরব আমিরাতের চমকপ্রদ চিত্র। আলট্রাটার বিলিয়নেয়ার সেন্সাস ২০২৬ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী মোট বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা দাড়িয়েছে ৫২ জনে। যৌথভাবে তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ২০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় দেশটিতে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ১.৯ শতাংশ কমলেও বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ১৫টি ধনকুবেরের বাজারের তালিকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
বিশ্বমঞ্চে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির আর্থিক প্রভাব বেশ সুদৃঢ়। বিশ্বজুড়ে থাকা মোট ৩ হাজার ৭৯৫ জন বিলিয়নিয়ারের প্রায় ১.৪ শতাংশের বসবাস এই আমিরাতে এবং বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ারদের মোট ১৫.১ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদের ১.৩ শতাংশের মালিক তারা।
বৈশ্বিক তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে ১৫তম স্থানে, যেখানে তাদের ঠিক আগেই রয়েছে প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরব। সৌদিতে বসবাসকারী ৫৯ জন বিলিয়নিয়ারের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার। নগরভিত্তিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যনগরী দুবাই বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ারদের অন্যতম পছন্দনীয় কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্বের সেরা শতকোটিপতি শহরগুলোর তালিকায় যৌথভাবে অষ্টম স্থান অধিকার করেছে দুবাই। গত বছরের তুলনায় আরও দুজন যুক্ত হয়ে দুবাইয়ে বর্তমানে বসবাস করছেন ৪৩ জন শতকোটিপতি। এই তালিকায় নিউইয়র্ক, হংকং, সান ফ্রান্সিসকো, লন্ডন, সিঙ্গাপুর, লস অ্যাঞ্জেলেস ও বেইজিংয়ের মতো প্রভাবশালী বৈশ্বিক পরাশক্তি শহরগুলোর ঠিক পরপরই অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে আমিরাতের এই আধুনিক মহানগরী।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা, উন্নত প্রযুক্তি এবং পুঁজির নিরবচ্ছিন্ন বিচরণের ফলেই বর্তমানে ধনকুবেরদের এই বৈশ্বিক বিন্যাস প্রতিনিয়ত নতুন রূপ নিচ্ছে। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, উদ্যোক্তা সহায়ক পরিবেশ, উচ্চমানের জীবনযাত্রা এবং বিশ্বমানের আর্থিক সেবার সুযোগ থাকায় বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেররা ক্রমান্বয়ে দুবাই কিংবা ইস্তাম্বুলের মতো উদীয়মান এশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে থিতু হচ্ছেন।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী শতকোটিপতিদের জনসংখ্যা ও সম্পদের পরিমাণ গড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ গতিতে বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ার জনসংখ্যা ৮.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ৩ হাজার ৭৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১২.৮ শতাংশ বেড়ে ১৫.১ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। যথারীতি ১ হাজার ২৬৫ জন শতকোটিপতি নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ৩৬৩ জন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে চীন এবং ২২১ জন বিলিয়নিয়ার নিয়ে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে জার্মানি। বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি দেশই বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ার সম্পদের ৮৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
প্রযুক্তি খাতের বিপুল বিকাশ, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-তে বিনিয়োগ এই বৈশ্বিক সম্পদ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এআই প্রযুক্তি খাতে অর্থবহ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার মূলধন অন্যান্য সাধারণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি সম্পদ অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতাও দৃশ্যমান। বিশ্বের শীর্ষ ২৯ জন ধনকুবের, যাদের প্রত্যেকের সম্পদের পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, তারা একাই বিশ্বব্যাপী সমস্ত বিলিয়নিয়ার সম্পদের ২৭ শতাংশের মালিক।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধনকুবেরদের মোট সম্পদের প্রায় ৭৩ শতাংশই নিবন্ধিত বা ব্যক্তি-মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ার হিসেবে রক্ষিত থাকে এবং মাত্র এক-চতুর্থাংশ সম্পদ নগদ বা তরল অবস্থায় থাকে। ফলে শেয়ারবাজারের উথালপাথাল ও ব্যবসায়ী মূল্যায়নের ওপর তাদের নিট সম্পদের উঠানামা অনেকাংশেই নির্ভরশীল।