গরমের সময় অনেকে প্রায় সারাদিন এসি চালু করে রাখেন। কেউ ১০-১২ ঘণ্টা, আবার কেউ ১৮-২০ ঘণ্টাও এসি ব্যবহার করেন। ফলে মাস শেষে বিদ্যুতের বিল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়। অনেকের ধারণা, নতুন ইনভার্টার এসি কিনলেই বিল কমে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। এসির ধরন, ব্যবহার পদ্ধতি, ঘরের পরিবেশ এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেটিংস সবকিছু মিলিয়েই বিদ্যুৎ খরচ নির্ধারিত হয়।তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। এমন কোনো সেটিংস নেই, যা একাই বিদ্যুতের বিল অর্ধেক করে দেবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় নির্ভর করে এসির স্টার রেটিং, প্রতিদিন কতক্ষণ চালানো হচ্ছে, ঘরের আয়তন, বাইরের তাপমাত্রা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। তাহলে আপনাকে যেসব বিষয়ে নজর রাখতে হবে জেনে নিন-
২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই রাখুন তাপমাত্রা
অনেকে মনে করেন, এসি ১৬ বা ১৮ ডিগ্রিতে সেট করলে ঘর দ্রুত ঠান্ডা হবে। কিন্তু এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস একটি আরামদায়ক এবং তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী তাপমাত্রা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সেটিংস প্রতি ১ ডিগ্রি বাড়ালে তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে। তবে প্রকৃত সাশ্রয় ব্যবহারের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে।
ফ্যান স্পিড অটো মোডে রাখুন
সবসময় হাই ফ্যান স্পিড ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। অটো মোড চালু থাকলে এসি ঘরের তাপমাত্রা বুঝে নিজেই ফ্যানের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাপ পড়ে না এবং কুলিংও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে।
রাতে স্লিপ মোড ব্যবহার করুন
রাতে ঘুমানোর সময় শরীরের কুলিং চাহিদা ধীরে ধীরে কমে। এ কারণেই স্লিপ মোড কয়েক ঘণ্টা পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি বাড়িয়ে দেয়। এতে আরাম বজায় থাকে, আবার অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচও কমানো সম্ভব হয়।
বৃষ্টি-ভ্যাপসা গরম, এসময় এসি কোন মোডে চালাবেন ইকো মোড থাকলে চালু রাখুন
বেশির ভাগ আধুনিক ইনভার্টার এসিতে ইকো মোড থাকে। এই মোডে কম্প্রেসর প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করে, ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ এড়ানো যায়। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে ঘরের তাপমাত্রা ও ব্যবহার পদ্ধতির ওপর।
বর্ষায় কুল নয়, ড্রাই মোড
বর্ষাকালে অনেক সময় তাপমাত্রার চেয়ে আর্দ্রতাই বেশি অস্বস্তির কারণ হয়। এমন পরিস্থিতিতে কুল মোড-এর পরিবর্তে ড্রাই মোড ব্যবহার করলে বাতাসের আর্দ্রতা কমে এবং ঘর আরও আরামদায়ক লাগে। অনেক ক্ষেত্রে এতে কম্প্রেসরও কম সময় চালু থাকে।
টাইমার ব্যবহার করুন
রাতভর এসি চালিয়ে রাখার প্রয়োজন হয় না। ঘুমানোর আগে টাইমার সেট করে রাখলে নির্দিষ্ট সময় পর এসি নিজেই বন্ধ হয়ে যাবে। এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ এড়ানো যায়।
ফিল্টার পরিষ্কার রাখুন
ধুলাবালি জমে গেলে এসির ফিল্টারের মাধ্যমে বাতাস ঠিকভাবে চলাচল করতে পারে না। ফলে কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা বজায় রাখতে এসিকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তাই গরমের মৌসুমে প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ অন্তর ফিল্টার পরিষ্কার করা ভালো।
দরজা-জানালা বন্ধ রাখুন
এসি চলার সময় দরজা বা জানালা খোলা থাকলে ঠান্ডা বাতাস বাইরে চলে যায়। এতে কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা ধরে রাখতে এসিকে আরও বেশি সময় কাজ করতে হয়। সরাসরি রোদ এড়াতে পর্দা বা ব্ল্যাকআউট ব্লাইন্ড ব্যবহার করলেও কুলিংয়ের কার্যকারিতা বাড়ে।
১৬ ডিগ্রিতে রাখলেই দ্রুত ঠান্ডা হয় না
এসি একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা অনুযায়ী কুলিং করে। তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রিতে নামিয়ে দিলেই ঘর দ্রুত ঠান্ডা হবে এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এতে এসি দীর্ঘ সময় ধরে কম্প্রেসর চালাতে পারে, যা বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দেয়।
স্মার্ট বা এআই ফিচার থাকলে ব্যবহার করুন
বর্তমানে অনেক এসিতে এআই বা স্মার্ট কুলিং মোড রয়েছে। এসব ফিচার ব্যবহারকারীর অভ্যাস ও ঘরের তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে কুলিং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিছু মডেলে আবার মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যও দেখা যায়। তবে শুধু এআই ফিচার থাকলেই বিদ্যুৎ বিল কমে যাবে এমন ধারণা ঠিক নয়।
স্টার রেটিংয়ের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি
নতুন এসি কেনার সময় শুধু স্মার্ট ফিচারের দিকে নজর দিলে হবে না। আগে দেখুন সেটির এনার্জি স্টার রেটিং কত। অনেক ক্ষেত্রে একটি ৫-স্টার এসি, উন্নত ফিচারবিহীন হলেও, ৩-স্টার স্মার্ট এসির তুলনায় কম বিদ্যুৎ খরচ করে। আসলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য কোনো একক কৌশল নেই। সঠিক তাপমাত্রা নির্বাচন, প্রয়োজনীয় মোড ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভালো স্টার রেটিংয়ের এসি সব মিলিয়েই বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই বিজ্ঞাপনের চেয়ে গুরুত্ব দিন সঠিক ব্যবহার অভ্যাসকে।