রবিবার ০৮ নভেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৩শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: November 08, 2026
June 03, 2026
জাতীয়
জাতীয়

গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়নের চক্র ভাঙতে সিপিজের সুপারিশ

Published: June 03, 2026 at 09:16 AM
গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়নের চক্র ভাঙতে সিপিজের সুপারিশ

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। মঙ্গলবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ আহ্বান জানিয়ে ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সংগঠনটি।  এতে বলা হয়েছে, দুই বছরে বাংলাদেশ তিনটি সরকার পেয়েছে। প্রতিটি পালাবদলের সময় সাংবাদিকেরা আটক, বিচার, নজরদারি, আক্রমণ ও অপবাদের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে আগের সরকারের সঙ্গে তাঁদের কথিত আনুগত্যের কারণ দেখিয়ে এসব করা হয়েছে।  সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে মূলত বাংলাদেশের প্রতিটি নতুন সরকারই পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে। বর্তমান সরকার এক্ষেত্রে ভিন্ন পন্থা অবলম্বনের দাবি করেছিলেন, কিন্তু ১০০ দিন পরেও কার্যকরী অগ্রগতি সীমিত পর্যায়েই রয়ে গেছে।  সিপিজের মতে, গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়নের চক্র ভাঙতে ১০টি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী, যা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। এই পদক্ষেপগুলো হলো :


১. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার বন্ধ

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা পর্যালোচনা, গণহারে এফআইআর ও একাধিক মামলা দেওয়ার চর্চা বন্ধ এবং সাংবাদিকতার কারণে করা মামলায় জামিনে বাধা না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। 


২. আইসিটি যেন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়

সাংবাদিকতার কাজকে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মামলা না করা এবং চলমান মামলাগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।


৩. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করা

যে সরকারের আমলেই ঘটনা ঘটুক না কেন, সাংবাদিক হত্যা, হামলা, নজরদারি ও হয়রানির ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং সেখানে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার থাকবে না। স্বচ্ছ, স্বাধীন তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের জন্য অর্থবহ প্রতিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটাতে হবে।


৪. গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সহিংসতা থেকে সুরক্ষা

বাংলাদেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠিত গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের সহিংসতা ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে দুটি বৃহত্তম সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২০২৫ সালে সিপিজে রাজনৈতিক কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ১০টি সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। সরকারকে এই সহিংসতার নিন্দা জানাতে হবে এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহির আওতায় আনতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে হবে।


৫. সাইবার আইন সংস্কার ও মামলা প্রত্যাহার

বর্তমান ও আগের সাইবার আইনগুলো গণমাধ্যম দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই আইনগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন এবং এসব আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো পর্যালোচনা করে প্রত্যাহার করতে হবে।


৬. সন্ত্রাসবিরোধী আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার বন্ধ

সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর মতো আইন সাংবাদিকদের আটক ও বিচারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারকে এসব আইন বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধন করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা সংকুচিত করতে হবে এবং বৈধ সাংবাদিকতার জন্য স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।


৭. প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ প্রত্যাহার

জাতীয় সম্প্রচার কমিশন ও জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনসংক্রান্ত খসড়া অধ্যাদেশ ২০২৬ এমন নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরির ঝুঁকি তৈরি করছে, যেগুলো শেখ হাসিনার সময়কার ব্যবস্থার মতো সম্প্রচার ও মুদ্রিত গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের উচিত বর্তমান আকারে এসব অধ্যাদেশ গ্রহণ না করা এবং এর পরিবর্তে স্বচ্ছ, বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা, যাতে যেকোনো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়।


৮. পুরোনো দমনমূলক আইন ও নজরদারি ব্যবস্থা সংস্কার

সরকারের উচিত অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধন করা; দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর মানহানির বিধান বাতিল করা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ সংশোধন করা, যাতে এটি সাংবাদিকদের খামখেয়ালিভাবে আটক করার জন্য ব্যবহার করা না যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর নজরদারি ও আড়ি পাতার বিধানগুলো সংস্কার করতে হবে, যাতে স্বাধীন বিচারিক তদারকি বাধ্যতামূলক হয় এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পরোয়ানাবিহীন আড়ি পাতা বন্ধ হয়।


৯. অ্যাক্রেডিটেশন ও এসএলএপিপি সংস্কার

সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের বর্তমান পদ্ধতি সংস্কার এবং হয়রানিমূলক মামলা (স্ট্র্যাটেজিক ল’সুটস এগেইনস্ট পাবলিক পার্টিসিপেশন—এসএলএপিপি) ঠেকাতে আইনি সুরক্ষা চালু করতে হবে।


১০. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। অপপ্রচার শুধু সাংবাদিকদের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না বরং তাঁদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং তথ্যসূত্রদের ভীত করে তোলে। এই হেয়প্রতিপন্ন করার সংস্কৃতির কারণে অনেক সাংবাদিক দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন এবং অন্যরা নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েছেন। সরকারকে স্পষ্ট ও বারবার জনসমক্ষে ঘোষণা দিতে হবে, স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে—তা–ও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।