আজ ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, প্রার্থনা ও বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দিবসটি উপলক্ষে আজ দেশে সাধারণ ছুটি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপন সংক্রান্ত নির্দেশিকায় ৭ নভেম্বরকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের সব তফশিলি ব্যাংকও আজ বন্ধ রয়েছে। দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আজ রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনী বক্তব্যের পর শোভাযাত্রাটি শুরু হবে।
দিবসটি উপলক্ষে সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। এ ছাড়া দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনীসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। বিএনপি দিবসটি উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতি, বৈষম্য ও ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সংকটময় সময়ে তাঁর ওপর রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় সংকট উত্তরণের দায়িত্ব অর্পিত হয়।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার ঐক্যের চেতনা পুনর্জাগরিত হয়েছিল ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে। সর্বস্তরের জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ষোলো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং দেশ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নতুন পথে এগিয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করেছিল। এদিন দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐক্য দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ছিল শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা ঐতিহাসিক এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পরাজিত হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করা জরুরি। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম। ভবিষ্যতে কেউ যেন দেশের জনগণের অধিকার হরণ কিংবা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
দেশজুড়ে নানা আয়োজন
দিবসটি উপলক্ষে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার উদ্যোগে দেশের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকায় সাজানো হয়েছে।
জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনায় দেশের মসজিদগুলোতে মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাত এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, শিশু পরিবার ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। দেশের শিশু পার্কগুলো শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও বেতারে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেশাত্মবোধক গানের আসর, আলোচনা সভা ও প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সশস্ত্র বাহিনীর উদ্যোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবারের আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্যাডেট কোরের তত্ত্বাবধানে বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে প্রদর্শিত হচ্ছে। এ ছাড়া পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থার সদর দপ্তরে দিবসটি উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
ছয় ঘণ্টা টোলমুক্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আজ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে টোলমুক্ত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। দিবসটি উপলক্ষে এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারকারী সব যানবাহনকে নির্ধারিত সময়ের জন্য টোল ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস স্মরণ করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার সম্মিলিত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়েছিল এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহত হয়েছিল।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৩, ৪ ও ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ কার্যত সরকারবিহীন অবস্থায় ছিল। এ সময় সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর বাসভবনে বন্দি করে রাখা হয়। ৬ নভেম্বর রাতে সংঘটিত সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্ত হন। পরদিন রেডিওতে তাঁর কণ্ঠে ‘আমি জিয়া বলছি’ বক্তব্য দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট মারুফ কামাল খান বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে দিনটি জাতীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট গাজীউল হাসান খান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনা অধিনায়ক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের জীবন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছিল। সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আবির্ভূত হন।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করা হচ্ছে।