বাংলাদেশকে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারকারী নয়, বরং এআই প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে সক্ষম একটি দেশে পরিণত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্ভাবনেও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা থাকবে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
এআই প্রযুক্তিতে সক্রিয় অংশীদার হওয়ার আহ্বান
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নিষ্ক্রিয় অংশীদার নয়, বরং সক্রিয় অংশীদার হওয়াই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এআইনির্ভর নয়, বরং এআই সক্ষম, উদ্ভাবনসমৃদ্ধ ও মানবকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এক মহাপরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আগামী দশকে এআই দেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, তা অনেকাংশেই নির্ধারণ করবে এই প্রযুক্তি।
রাষ্ট্রপতির মতে, এআই শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রযুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কোটি তরুণের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এআইকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। তরুণদের প্রযুক্তিবান্ধব ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তারা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রধান সৈনিকে পরিণত হবে।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় আগামী কয়েক বছরে এআই বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজন করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশকেও এই সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
ব্যবসায়ী সমাজকে এআইকে শুধু ব্যয় কমানোর হাতিয়ার হিসেবে না দেখে নতুন পণ্য ও সেবা সৃষ্টি, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণ প্রজন্মকে একসঙ্গে কাজ করে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
এআই ব্যবহারে ঝুঁকি ও নিরাপত্তার বিষয়েও সতর্কতা
রাষ্ট্রপতি বলেন, এআইয়ের সুফল পেতে দেশের তরুণ সমাজকে প্রযুক্তিতে দক্ষ ও সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বে দেশকে পরিচিতি দিয়েছে। একইভাবে তরুণরা যথাযথ সক্ষমতা নিয়ে এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারলে বিশ্বে বাংলাদেশকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এআইয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে মূল্যবোধকেন্দ্রিক জাতীয় এআই নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে। এতে নৈতিকতা, মানবাধিকার, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয় এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে।
তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শিক্ষিত বেকার হওয়ায় এআই নতুন করে বেকারত্ব সৃষ্টি করবে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে বলে জানান রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, এআই ব্যবহারে বড় সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকি ও আশঙ্কাও রয়েছে। এই প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রতিটি পর্যায়ে সতর্ক থাকতে হবে। এআইয়ের নিরাপদ ব্যবহার ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মানবসভ্যতা অস্তিত্বের সংকটেও পড়তে পারে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, কোনো প্রযুক্তি গ্রহণের আগে সেটি কতটা টেকসই এবং দেশের জন্য কতটা উপযোগী, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করতে হবে। মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতে পারে—এমন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রযুক্তি তখনই প্রকৃত অর্থে উপযোগী হয়, যখন তা মানুষের কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এআইয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সামিটে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা
অনুষ্ঠানের আগে রাষ্ট্রপতিকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
সামিটে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (আইসিসি), বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান।
মূল বক্তব্য দেন রেডিনেস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমস লিমিটেড, যুক্তরাজ্যের সিইও ও সাবেক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বক্তব্য দেন।