আটলান্টিক পেরিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসবহুল রেসিডেনসিয়াল ক্রুজ ‘ভিলা ভি অডিসি’র চাকা অবশেষে থমকে গেছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে কোম্পানিটি তাদের বহু প্রতীক্ষিত সাড়ে তিন বছরের বিশ্বভ্রমণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দরে জাহাজটি নোঙর করতে বাধ্য হয়েছে এবং জাহাজে থাকা প্রায় দুই শতাধিক বিদেশি পর্যটকের জীবন এখন ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মার্কিনভিত্তিক পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ‘ভিলা ভি রেসিডেনসেস’ মঙ্গলবার এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করে জানায়, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক হারে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের ব্যবসায়িক পরিচালনা মডেল টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মূলত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে এই বিলাসবহুল জাহাজের বাজেটে।
কোম্পানিটির হিসাব মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজের জ্বালানি খরচ ৩০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে ইতিপূর্বে প্রতি কেবিনের জন্য মাসে গড়ে প্রায় ১,৮০০ ডলার জ্বালানি বাবদ ব্যয় হতো, সেখানে বর্তমানে এশিয়ান অঞ্চলে ভ্রমণের সময় কেবিনপ্রতি সেই খরচ গিয়ে ঠেকেছে ৬,০০০ থেকে ৮,০০০ ডলারে। এমন অস্বাভাবিক ব্যয়ভার বহনে হিমশিম খেয়ে শেষ পর্যন্ত যাত্রা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
চলতি সপ্তাহের শুরুতেই সিহানুকভিল বন্দরে ক্রুজটি নোঙর করার পর পর্যটকদের জাহাজ থেকে নামিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। জাহাজটিতে ১৫টি দেশের প্রায় ২০০ জন যাত্রী অবস্থান করছিলেন, যাদের বড় একটি অংশই মার্কিন নাগরিক। এ ছাড়া জাহাজে ১৫৬ জন ক্রু সদস্যও ছিলেন।
হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তে পর্যটকদের মাঝে চরম হাহাকার ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে জমিজমা ও ঘরবাড়ি বিক্রি করে সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে সমুদ্রের বুকে বাস করার স্বপ্ন নিয়ে এই জাহাজে উঠেছিলেন। ভাসমান এই বিলাসবহুল প্রাসাদকেই তারা নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু কম্বোডিয়ার বন্দরে এসে সেই স্বপ্ন এক লহমায় ফিকে হয়ে গেল।
অপারেটর সংস্থা ভিলা ভি রেসিডেনসেসের প্রতিষ্ঠাতা মিকেল পেটারসন জানিয়েছেন, বর্তমানে তারা যাত্রীদের কম্বোডিয়ায় সাময়িক থাকার হোটেল ভাড়া এবং স্থানীয় যাতায়াত খরচ বহন করছেন। তবে সেখান থেকে যাত্রীদের নিজ নিজ দেশে ফেরার আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়া বা ভ্রমণের খরচ কোম্পানি বহন করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, নতুন অঞ্চলে জাহাজটি পরিচালনা করতে এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। জ্বালানির ঊর্ধ্বগতির সামাল দিতে প্রতি মাসে কেবিনপ্রতি অতিরিক্ত ৫০০ ডলার ফি এবং আলাদা ফুয়েল সারচার্জ আরোপের পরিকল্পনা চলছে। তবে যাত্রীদের একটি বড় অংশ এই বাড়তি খরচ বহন করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কোম্পানিটি বর্তমানে নতুন অর্থায়নের খোঁজ করছে যাতে পুনরায় যাত্রা চালু করা যায়, কিন্তু জাহাজটি কবে নাগাদ বন্দর ছাড়তে পারবে তা এখনো সম্পূর্ণ অস্পষ্ট।
উল্লেখ্য, সাধারণ ট্যুরিস্ট ক্রুজের সঙ্গে ‘ভিলা ভি অডিসি’র মূল তফাৎ ছিল এর পরিচালনা পদ্ধতিতে। এটি কোনো নির্দিষ্ট কয়েক দিন বা সপ্তাহের ছুটির জন্য ছিল না, বরং এতে দীর্ঘদিন কিংবা আজীবন বসবাস করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। সমুদ্রের বুকে ভাসমান জীবনযাত্রার সুযোগ দিতে এতে গড়ে তোলা হয়েছিল আধুনিক সব সুবিধা। সুইমিং পুল, রেস্তোরাঁ, বার, জিম থেকে শুরু করে পিকলবল কোর্টের মতো নানা আয়োজন ছিল এতে। কেবিনগুলোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার ডলার থেকে শুরু করে ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত। মাসিক মোট খরচের বিনিময়ে অবসরের জীবনটা বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ানোর দারুণ মাধ্যম হিসেবে এটি প্রবীণ ও ধনী পর্যটকদের আকৃষ্ট করেছিল।
সাড়ে তিন বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫০টি দেশ ভ্রমণের লক্ষ্য নিয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট থেকে জাহাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তবে যাত্রার শুরুতেই বিপত্তি দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘ সময় মেরামতের কাজ চলায় বেলফাস্টেই কয়েক মাস আটকে থাকতে হয়েছিল যাত্রীদের, যা কোম্পানির ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, তোঙ্গা এবং অস্ট্রেলিয়া ঘুরে এশিয়ায় এসে অবশেষে জ্বালানিসংকটে থমকে গেল এই ভাসমান শহরের গতি। যাত্রীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং বিশ্বভ্রমণের অসমাপ্ত স্বপ্ন নিয়ে ‘ভিলা ভি অডিসি’ এখন কম্বোডিয়ার উপকূলে এক বিরতিহীন অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।