নাটোরের বড়াইগ্রামে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মহাসড়কে অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে বাসটির সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ হয়ে থাকতে পারে। দুর্ঘটনায় বাস ও ট্রাকের চালকও নিহত হয়েছেন। আজ ভোর ৪টার দিকে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন— রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে মো. সোহেল রানা (৪০) ও বাগমারা থানার চায়পাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০); পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ থানার সুবিদ আলী গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাসফিয়া (৮) ও পূর্ব সুবিদখালী গ্রামের আজাহার হাওলাদারের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৪৫); ঝিনাইদহ জেলার বরাতলা থানার বরানগড় গ্রামের বাসিন্দা (বাবার নাম অজ্ঞাত) কালাম (৩৫), তিনি পেশায় একজন ট্রাকচালক ছিলেন; শরীয়তপুর জেলার জাজিরা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল (৪০), ডুবি সাহাবুর গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে সালাল মোল্লা (৪৫), একই গ্রামের ইউনুসের ছেলে সোহাগ (৩০) ও আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ (৭০) এবং কাজিরহাট গ্রামের রাজ্জাকের ছেলে শাহিন (৩৫)।
বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই শামীম হোসেন জানান, আরপি পরিবহনের বাসটি বরগুনা থেকে যাত্রী নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। অন্যদিকে, পঞ্চগড় থেকে বালু নিয়ে একটি ট্রাক যাচ্ছিল ঝিনাইদহের দিকে। ভোরে সরকারপাড়া এলাকায় পৌঁছালে যানবাহন দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
এসআই শামীম হোসেন বলেন, ট্রাকটি মহাসড়কের বাম পাশের লেন দিয়ে চলছিল। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, দ্রুতগতিতে চলা বাসটি অন্য একটি যানবাহনকে ওভারটেক করার সময় ট্রাকটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান আরো কয়েকজন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছেন।
তাদের মধ্যে একজন সেনা কর্মকর্তা আছেন বলে জানিয়েছেন নাটোরের পুলিশ সুপার (এসপি) শরীফুল ইসলাম। দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল, বড়াইগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতাল এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। নিহত অন্যদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে।
দুর্ঘটনার সময় বাসে থাকা যাত্রী আব্দুস সালাম বলেন, বাসটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ছিলেন। সব আসন পূর্ণ থাকায় অনেককে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছিল। যাত্রীদের ভিড়ে বাসের ভেতরে পা ফেলারও জায়গা ছিল না। তার ভাষ্য, বাসটি দ্রুতগতিতে চলছিল এবং চালক মাঝেমধ্যে জোরে ব্রেক করছিলেন। এতে যাত্রীরা আসন থেকে ছিটকে পড়ছিলেন।
এদিকে নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ, জেলা প্রাশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার শরীফুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৭ সদস্যদের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
হুইপ দুলু বলেন, দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। তাছাড়া দুর্ঘটনা রোধে পাবনা-বনপাড়া মহাসড়কটি প্রশস্ত করার উদ্যেগ নেবেন তিনি।
তদন্তে কমিটি : এ ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে সরজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুর্ঘটনার কারন উদঘাটন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
আজ বিকেলে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আসমা খাতুন এ তথ্য জানিয়েছেন। কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) মো. আবুল হায়াতকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি, বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর একজন প্রতিনিধি, বনপাড়া হাইওয়ে থানার ওসি, বিআরটিএ নাটোরের সহকারী পরিচালক এবং নাটোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক।
নাটোরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোছা. সুমনী আক্তার বলেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি কাজ করবেন। কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। তবে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত আরপি পরিবহনের বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না।
নাটোর বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ চলতি বছরের ১৩ মে শেষ হয়েছে। তবে বাসটির রুট পারমিটের মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত। ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাসটি কীভাবে চলাচল করছিল, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।