কোরবানির ঈদকে ঘিরে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গরুর খামারিরা। জেলায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত পশু থাকার পরও ভারত থেকে চোরাই পথে গরু আসায় এবং গোখাদ্য ও পরিচর্যা খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন তারা। এর পাশাপাশি হাটে নেওয়ার পথে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) হাতে হয়রানির আশঙ্কাও করছেন ক্ষুদ্র খামারিরা। জেলার কানসাট, তরতিপুর ও সোনাইচন্ডিসহ বিভিন্ন পশুর হাটে ছোট-বড়ো নানা জাতের গরু নিয়ে বসেছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। এসব হাটে দেশি পশুর পাশাপাশি ভারতীয় গরুও লক্ষ্য করা গেছে। খামারিদের অভিযোগ, অবৈধভাবে ভারতীয় গরু আসার কারণে দেশি গরুর আশানুরূপ দাম পাওয়া যাচ্ছে না। শিবগঞ্জ উপজেলার আট রশিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি পলাশ উদ্দিন জানান, সব পুঁজি খাটিয়ে তিনি খামারটি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু ভারত থেকে গরু আসার খবরে তিনি চরম আতঙ্কে রয়েছেন। ইতিমধ্যে প্রায় এক লাখ টাকা লোকসানে খামারের পাঁচটি গরু বিক্রি করলেও এখনও ছয়টি গরু রয়ে গেছে। পলাশ বলেন, ভারত থেকে গরু চোরাচালান হওয়ায় আমার পোষা সর্ববৃহৎ গরুটি বাড়ি থেকেই ন্যায্য মূল্যের চেয়ে এক লাখ টাকা কমে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। গরুটি হাটে নিতে পারলে ওজন অনুযায়ী আরও বেশি দাম পেতাম। কিন্তু হাটে নেওয়ার পথে বিজিবির হয়রানির মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় তারা বুঝতে চায় না যে এসব গরু আমাদের বাড়িতে লালন-পালন করা। বিজিবির ধারণা, এসব গরু দেখতে অনেকটা ভারতীয় মনে হওয়ায় তারা ক্ষুদ্র খামারিদের কথা মানতে চায় না, আটক বা হয়রানি করে।
একই উপজেলার কালুপুর গ্রামের জাহিদ হাসান জানান, তিনটি গরু হাটে নামিয়েও তিনি আশানুরূপ দাম পাননি। পরিচর্যা ও গোখাদ্যের দাম বাড়লেও ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে তিনটি গরুতে তার ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে। এই পরিস্থিতির জন্য তিনি চোরাই পথে আসা ভারতীয় গরুকে দায়ী করেন। কালুপুরের রশিদ ফার্মের শ্রমিক তারেক রহমান বলেন, গত বছরও আমাদের খামারের ১২টি গরু সব বিক্রি হয়েছিলো। এবার এখনও একটিও বিক্রি হয়নি। খাদ্যের দাম বেশি, তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগবালাই ও তাপমাত্রা বেড়েছে। ফলে পরিচর্যা খরচ বাড়লেও ভারতীয় গরুর কারণে উল্টো দাম কমে গেছে। জেলার অন্যতম বৃহৎ খামার ‘রশিদ খামার’-এর মালিক মো. আশরাফুল আলম রশিদ সরকারের কাছে সুদমুক্ত লোন এবং সময়মতো গরুর টিকা পাওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সার্বক্ষণিক ফ্যান ও পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে। তীব্র তাপদাহে গত মাসে আমার পাঁচটি গাভীর বাচ্চাও মারা গেছে। এর ওপর রয়েছে টিকা সঙ্কট। এই অবস্থায় বাইরে থেকে গরু আসলে খামারিরা বড়ো লোকসানে পড়বেন। শিবগঞ্জের রুহুল এগ্রো ফার্মের মালিক রুহুল আমিন জানান, জেলার বিপুল সংখ্যক খামারি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে, নিজেদের জমির ঘাস ও মানসম্মত দানাদার খাবার খাইয়ে এসব পশু প্রস্তুত করেছেন। কানসাট পশুর হাটের ইজারাদার মো. আমিনুল ইসলাম জানান, হাটে জাল নোট শনাক্তে ব্যাংক কর্মকর্তাসহ সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে এ বছর এখনও গরুর হাটগুলো জমে উঠেনি এবং ক্রেতাও কম। হাটে ভারতীয় গরুর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচটি উপজেলায় ছোট-বডড়ো মিলিয়ে এবার দুই লাখ ২৬ হাজার ৫০টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর বিপরীতে জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা এক লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি। ফলে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বা ৫৮ হাজার ৮৪৮টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে, যা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে। প্রস্তুত করা পশুর মধ্যে ৪৩ হাজার ৮২৪টি ষাঁড়, ৩৬ হাজার ৩৩১টি বলদ, ৩৬8৫৫টি গাভী, ৫০৬টি মহিষ, ৮৪ হাজার ৮০১টি ছাগল ও ১২ হাজার ৯২২টি ভেড়া রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোসা. শারমিন আক্তার বলেন, আমাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত পশু রয়েছে। তাই ভারত থেকে কোনো পশু আসলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শিবগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পশু কেনাবেচা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। অবৈধভাবে যেন কোনো পশু না আসে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গরু রাতের অন্ধকারে আসলেও সেগুলো জব্দ করা হচ্ছে। নাইট ভিশন ক্যামেরাসহ কঠোর নজরদারির মাধ্যমে জিরো টলারেন্স নীতিতে চোরাচালান ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রকৃত খামারিদের হয়রানির বিষয়টি সঠিক নয়। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভারত থেকে গরু এনে নামেমাত্র প্রতিপালন করে হাটে বিক্রির চেষ্টা করলে, প্রকৃত খামারিদের বাঁচাতে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।