যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ওমান উপসাগর ও খারগ দ্বীপের কাছে পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে এর জবাব দেওয়ার দাবি করেছে ইরান।
এ ছাড়া আরও দুটি মার্কিন জলযান ও আটটি ট্যাংকে হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আমেরিকা ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের ছয় মাস পূর্তির সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই নতুন করে এসব পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর জুনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। আগস্টে সামরিক তৎপরতা তুলনামূলক কম থাকলেও সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলায় সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ওই সমঝোতা স্মারকে পারস্পরিক শত্রুতার অবসান, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়গুলো রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ ছিল। তবে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেছে এবং ওয়াশিংটন ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
পাঁচ তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত দুই দিনে ইরানের আইআরজিসি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে দুবার লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করে। তবে জাহাজটি ইরানের হামলার চেষ্টা সফলভাবে এড়িয়ে যায়। এতে কোনো মার্কিন সেনা বা কর্মী হতাহত হননি বলেও জানানো হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের তেলবাহী ট্যাংকার এম/টি কাভিজ, এম/টি চারমিনার, এম/টি হরাইজন-১ ও এম/টি রিয়েস্কো এবং খারগ দ্বীপের কাছে এম/টি দেরিয়াতে হামলা চালানো হয়। হামলায় জাহাজগুলো ধ্বংস বা অকেজো হয়ে যাওয়ার আগে মার্কিন বাহিনী নাবিকদের জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি খারগ দ্বীপের কাছে মার্কিন হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার দাবি
ইরান দাবি করেছে, মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এতে মার্কিন যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গারগুলো ধ্বংস হয়েছে বলেও দাবি করেছে তেহরান।
এ ছাড়া মার্কিন নৌবাহিনীর ডিডিজি-১১৯ ও ডিডিজি-৫৩ ডেস্ট্রয়ারের ওপর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। হামলায় জাহাজ দুটির মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, তাদের নৌবাহিনী এ অঞ্চলে দুটি মার্কিন জলযান ও আটটি ট্যাংকে হামলা চালিয়েছে। এতে সেগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
২০ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার দাবি জর্ডানের
এদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করেছে। এর মধ্যে ১৮টি সফলভাবে প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়েছে বলে জানিয়েছে জর্ডান।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলী আবদুল্লাহি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হলে তেহরান এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালাবে।
বাড়ছে তেলের দাম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে সংঘাতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। বুধবার প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বেড়ে ৯৯ দশমিক ৪৯ ডলারে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দাম—দুই ক্ষেত্রেই নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।