কোরিয়ান ‘গ্লাস স্কিন’ কিংবা জাপানিদের মসৃণ, উজ্জ্বল ত্বক এখন বিশ্বজুড়ে সৌন্দর্যপ্রেমীদের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে কেউ দামি স্কিনকেয়ার ব্যবহার করছেন, কেউ আবার বায়ো কোলাজেন মাস্ক, রেড লাইট থেরাপি কিংবা পেপটাইড ট্রিটমেন্টের ওপর ভরসা রাখছেন। তবে এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে জাপানের এক ব্যতিক্রমী বিউটি থেরাপি-‘এনজাইম বাথ’ বা জাপানি ভাষায় ‘ওগাকুজু-বুরো’। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, কাউকে যেন জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে! কিন্তু বাস্তবে এটি জাপানের বহু পুরোনো একটি স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যচর্চার পদ্ধতি, যা এখন ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের সৌজন্যে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
কী এই এনজাইম বাথ?
এনজাইম বাথ কোনো পানিভর্তি বাথটাব নয়। বরং বড় কাঠের চৌবাচ্চায় ভরা থাকে সিডার বা সাইপ্রেস গাছের মিহি কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ এবং ফল ও সবজি থেকে তৈরি প্রাকৃতিক এনজাইমের বিশেষ মিশ্রণ। এই মিশ্রণের ভেতরে একজনকে শুইয়ে গলা পর্যন্ত ঢেকে দেওয়া হয়। বাইরে শুধু মাথাটি খোলা থাকে। এরপর ৩০ থেকে ৫০ মিনিট পর্যন্ত সেই উষ্ণ মিশ্রণের মধ্যে বিশ্রাম নিতে হয়।
কোথা থেকে আসে এই তাপ?
এই থেরাপির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, এখানে কোনো বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহার করা হয় না। কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ ও এনজাইমের মধ্যে থাকা উপকারী অণুজীব ফারমেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই তাপ উৎপন্ন করে। ফলে পুরো মিশ্রণের তাপমাত্রা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই প্রাকৃতিক উষ্ণতায় শরীর দ্রুত ঘামতে শুরু করে এবং অনেকেই এটিকে প্রাকৃতিক সনা বাথের সঙ্গে তুলনা করেন।
উজ্জ্বল ত্বকের জন্য কেন এত জনপ্রিয়?
জাপানের বিভিন্ন স্পা সেন্টারের দাবি, এনজাইম বাথ ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে সাহায্য করে। ঘামের মাধ্যমে ত্বকের রোমকূপ পরিষ্কার হয় এবং ত্বক আরও সতেজ ও মসৃণ দেখায়। এনজাইমের প্রভাবে ত্বকের ওপর জমে থাকা ময়লা ও ডেড স্কিন সেল নরম হয়ে সহজে দূর হয়। ফলে অনেকের ত্বকে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ফিরে আসে, যাকে অনেকেই ‘গ্লাস স্কিন’ লুক বলে বর্ণনা করেন।
শুধু সৌন্দর্য নয়, শরীরও পায় আরাম
এনজাইম বাথকে শুধু বিউটি ট্রিটমেন্ট নয়, বরং একটি রিল্যাক্সেশন থেরাপিও বলা হয়। উষ্ণতার কারণে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়তে পারে, পেশির টান কমতে পারে এবং দীর্ঘদিনের ক্লান্তি কিছুটা লাঘব হতে পারে। অনেকেই কর্মব্যস্ত সপ্তাহ শেষে শরীরকে আরাম দিতে এই থেরাপি বেছে নেন। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, অতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে শরীরের কিছু বর্জ্য উপাদান বেরিয়ে যায়। যদিও ‘ডিটক্স’ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখনও বিভিন্ন মত রয়েছে, তবুও এই থেরাপি শরীরকে সতেজ অনুভব করাতে সাহায্য করতে পারে।
ভাইরাল হচ্ছে এই থেরাপি?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনজাইম বাথের ভিডিও দেখলেই বোঝা যায় এর জনপ্রিয়তার কারণ। মাথা ছাড়া পুরো শরীর কাঠের গুঁড়ার নিচে ঢাকা-এই দৃশ্য একদিকে যেমন অদ্ভুত, অন্যদিকে বেশ আকর্ষণীয়ও। তাই ইনফ্লুয়েন্সাররা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতেই লাখ লাখ মানুষ ভিডিওগুলো দেখছেন। অনেকেই এটিকে ‘ন্যাচারাল সনা’, আবার কেউ বলছেন ‘উড স্পা থেরাপি’।
সবার জন্য কি উপযোগী?
যদিও এনজাইম বাথ বর্তমানে ট্রেন্ডিং, তবুও এটি সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। যাদের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, গর্ভাবস্থা বা অতিরিক্ত তাপ সহ্য করতে সমস্যা রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ধরনের থেরাপি নেওয়া উচিত নয়। এছাড়া যাদের ত্বকে অ্যালার্জি বা সংবেদনশীলতার সমস্যা রয়েছে, তাদেরও আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ঐতিহ্য থেকে বিশ্ব ট্রেন্ড
জাপানে অনেক বছর ধরেই এনজাইম বাথ সুস্থতা ও বিশ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের সৌজন্যে এটি এখন আন্তর্জাতিক বিউটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। ত্বকের উজ্জ্বলতা, শরীরের আরাম এবং ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা সমন্বয়ই এনজাইম বাথকে বিশ্বজুড়ে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে। সুন্দর ও সুস্থ থাকার জন্য মানুষ যে প্রতিনিয়ত নতুন পথ খুঁজছে, জাপানের এই ভাইরাল থেরাপি তারই আরেকটি অনন্য উদাহরণ।