অলসতাকে হারানো মানে নিজেকে জিতিয়ে নেয়া। তাই নিয়ম কোনো জাদু নয়, এগুলো হলো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা জীবনদর্শন। জাপানিরা মনে করে অলসতা একটি অসুখ বিশেষ। আমাদের জীবনের সবচেয়ে নীরব কিন্তু ভয়ংকর শত্রু হলো অলসতা (Laziness)। এটা একদিনে কোনোকিছু ধ্বংস করে না। বরং ধীরে ধীরে আপনার স্বপ্ন, সময়, সুযোগগুলোকে আপনার জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো- জাপানিরা কেবলমাত্র ইচ্ছাশক্তি দিয়ে নয়, তারা কিছু সিস্টেম, দর্শন ও জীবনচর্চার মাধ্যমে অলসতাকে জয় করেছে। কথায় আছে- নো অর নেভার অর্থাৎ হয় এখন না হয় কখনোই না। সেটা হতে পারে- বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্ম পেপার রেডি বা অফিসের কোনো প্রেজেন্টেশনের কাজ। এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়ে থাকে ডেডলাইনের আগের রাতে করার জন্য। আজ থাক কাল করবো- এভাবেই দিনের পর দিন অনেক কাজ জমে যায় নানান বাহানা। হরেক অজুহাতে এই কর্মবিমুখতার নাম হচ্ছে- অলসতা। অলসতার কারণে কেবল যে কাজের ব্যাঘাত ঘটে তা কিন্তু নয়, অলসতায় শরীর ও মন বিরূপ প্রভাবিত হয়। অলসতাকে হারানো মানে নিজেকে জিতিয়ে নেয়া। তাই নিয়ম কোনো জাদু নয়, এগুলো হলো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা জীবনদর্শন। আপনি যদি ১ দিনও শুরু করেন, জীবন বদলাবে না। কিন্তু যদি ৩০ দিন চালিয়ে যান, তাহলে আপনি নিজেই আর আগের মানুষ থাকবেন না। আপনার মাঝে যদি অলসতার প্রভাব থেকে থাকে তাহলে জেনে নিন অলসতা থেকে বের হয়ে আসার কিছু জাপানি নিয়ম।
এক. কাইজেন (Kaizen) : ১ মিনিটের জাদু
কাইজেন মানে হলো- একসাথে বড় কিছু করার চাপ না নিয়ে, অতি ছোট পদক্ষেপে শুরু করা। তাই ছোট ছোট অভ্যাস দিয়ে শুরু করুন বড় পরিবর্তন আনবে।
-১ মিনিট পড়া
-১টি পুশ-আপ
- ১ লাইন লেখা
নিয়মটা খুব সহজ: এত ছোটভাবে শুরু করা, যেন আপনার মন ‘না’ বলতে না পারে। আসল শক্তি এখানেই। শুরু করা-তেই লুকানো রয়েছে অভ্যাস পরিবর্তনে যাদুকাঠি। কেননা শুরু হলেই ধারাবাহিকতা তৈরি হয়।
ইকিগাই (Ikigai) : ইকিগাই মানে- বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে বের করা। জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া। যার উদ্দেশ্য আছে, তার অলসতা নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠার একটি স্পষ্ট কারণ থাকলে মানুষ আর অলস থাকতে পারে না। আপনি ভাবুন তো-
- আমি কেন বাঁচছি?
- আমি কী তৈরি করতে চাই?
- আমি কার জন্য কাজ করছি?
তাহলেই আপনার উদ্দেশ্য পরিষ্কার হবে, আলসতা দুর্বল হবে।
হারা হাচিবু (Hara Hachi Bu) : ৮০% নিয়ম। এই নিয়ম বলে, পেট ১০০% ভরবে না, বরং ৮০% পূর্ণ হলেই থামো। তাহলেই শরীর হালকা, মন হবে ফোকাসড।
- অতিভোজন শরীরকে ভারী করে
- ভারী শরীর মানে অলস মন
- আর হালকা শরীর মানে বেশি এনার্জি। শরীরকে হালকা রাখলে কাজ করার ইচ্ছাও বাড়ে।
ফোকাস রুটিন : ২৫ মিনিটের ম্যাজিক টাইমার। একটা সময় একটাই কাজ-
- ২৫ মিনিট কাজ
- ৫ মিনিট বিরতি। এটাই Pomodoro-style focus system এর মতো জাপানি অনুপ্রেরণার অংশ।
- কাজ শুরু করার আগে ৩টি গভীর শ্বাস নিন। এটা মস্তিষ্ককে বলে: এখন ফোকাস করার সময়। মাল্টিটাস্কিং নয়, ডিপ ফোকাসই সাফলতা আনে।
সেইরি ও সেইতোন (Seiri & Seiton) : পরিবেশ গোছানো। অগোছালো ঘর, অফিস বা কর্মক্ষেত্র মানেই অগোছালো মন।
- অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলুন
- প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখুন
- পরিষ্কার পরিবেশ মানে পরিষ্কার চিন্তা
- পরিষ্কার চিন্তা মানে বেশি প্রোডাক্টিভিটি
- বাহির যত গোছানো, ভিতর তত শান্ত।
কিনৎসুগি (Kintsugi) : ভাঙা থেকে শক্ত হওয়া। জাপানে ভাঙা জিনিস সোনা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়- এটাই কিঞ্চুগি। পারফেকশন নয়, প্রগ্রেস গুরুত্বপূর্ণ-
- ভুল মানেই শেষ নয়
- ব্যর্থতা মানেই থেমে যাওয়া নয়
- কাজ অসম্পূর্ণ হলেও শেষ করুন। কারণ অসম্পূর্ণ শুরুই সম্পূর্ণ সাফল্যের দরজা খুলে দেয়।
ওয়াবি-সাবি (Wabi-Sabi) : অসম্পূর্ণতাকেই গ্রহণ করা। Perfect সময় কখনো আসে না, তাই-
- আজই শুরু করুন
- যা আছে তাই নিয়ে শুরু করুন
জীবন কখনোই পারফেক্ট হবে না, কিন্তু শুরু না করলে কিছুই যে হবে না। Perfect সময়ের অপেক্ষা আসলে আলসতার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
সিস্টেম (System) : নিজের জীবন ট্র্যাক করা। যা মাপা যায়, তা উন্নত করা যায়
- প্রতিদিনের কাজ লিখে রাখুন
- নিজের প্রগ্রেস ট্র্যাক করুন
- অভ্যাস পরিবর্তনের ধারা পর্যবেক্ষণ করুন।
মনে রাখবেন, চোখে দেখা অগ্রগতি মানুষকে মোটিভেট করে।
- আর মোটিভেশন থেকে জন্ম নেয় অভ্যাস
- ইচ্ছা নয়, সিস্টেমই জীবন বদলাবে আপনার।