ফুটবল বিশ্বকাপে হার-জিত সাধারণ বিষয়, নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের গল্পটা শুধু মাঠের ৯০ মিনিটে আটকে থাকেনি। ভিসা জটিলতা, দীর্ঘ ভ্রমণ, প্রশাসনিক বাধা, শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়া গোল, দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার বাধ্যবাধকতা এবং বিদায়বেলায় ড্রেসিংরুমে রেখে যাওয়া একটি আবেগঘন বার্তা, সব মিলিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায় হয়ে রইলো ফুটবল ইতিহাসে।
মেক্সিকোতে ঘাঁটি, সীমান্ত পেরিয়ে ম্যাচ
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই শুরু হয়েছিল সমস্যার সূত্রপাত। যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি অবস্থান করতে না পেরে ইরানকে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে থাকতে হয়েছিল মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। প্রতিটি ম্যাচ খেলতে সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হয়েছে, আবার ম্যাচ শেষেই ফিরে আসতে হয়েছে।
দলের অভিযোগ, এই যাতায়াত তাদের বিশ্রাম, অনুশীলন এবং ম্যাচ প্রস্তুতিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমনকি দলের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সহায়ক স্টাফও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য জানায়, নিরাপত্তাজনিত কারণেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
কোচ ও অধিনায়কের ক্ষোভ
ইরানের কোচ আমির ঘালেনোয়ি পরে ক্ষোভ চেপে রাখেননি। তার ভাষায়, এই বিশ্বকাপে তাদের দল ছিল ‘সবচেয়ে নিপীড়িত’। ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমিও বলেন, খেলার চেয়ে ভ্রমণ ও প্রশাসনিক জটিলতার সঙ্গেই যেন বেশি লড়াই করতে হয়েছে। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এমন পরিস্থিতিকে তিনি ‘বিপর্যয়’ বলেও অভিহিত করেন।
ভিএআরে ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন
তবু মাঠে ইরান হার মানেনি। তিন ম্যাচেই ড্র করে শেষ পর্যন্ত নকআউটের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছিল। মিশরের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে যোগ করা সময়ে শোজা খলিলজাদেহ বল জালে জড়াতেই ইরানি সমর্থকেরা উদ্যাপনে মেতে ওঠেন। সেই গোল হলে ইরানের নকআউট নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেত। কিন্তু ভিএআরের দীর্ঘ পর্যালোচনার পর অফসাইডের সিদ্ধান্ত আসে। গোল বাতিল হয়। নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল, কিন্তু সেটিই কার্যত ইরানের ভাগ্য বদলে দেয়। ম্যাচ শেষ হয় ১-১ সমতায়। এরপরও আশায় ছিল ইরান। কিন্তু পরদিন অন্য গ্রুপের ফল তাদের বিপক্ষে যায়। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচে ৩-৩ গোলে ড্রয়ের ফলে সেরা তৃতীয় স্থানধারীদের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ে ইরান। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে, তাতে অবশ্য কিছু আসে যায় না। পুরো টুর্নামেন্টে কোনো ম্যাচ না হেরেই শেষ হয়ে যায় ইরানের এবারের বিশ্বকাপ।
বিদায়েও সৌজন্যের ছাপ
বিদায়ের মুহূর্তেও ক্ষোভের পাশাপাশি সৌজন্য দেখিয়েছে ইরান। সিয়াটলের ড্রেসিংরুমে তারা হাতে লেখা একটি বার্তা রেখে যায়, যা শুধু একটি ধন্যবাদ নোট নয়, বরং পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তাদের অভিজ্ঞতার এক সংক্ষিপ্ত প্রতিফলন। বার্তায় তারা লিখেছিল, ‘সিয়াটল, আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য ধন্যবাদ। আমরা এখানে সম্মান নিয়ে খেলেছি, এবং সেই সম্মান নিয়েই বিদায় নিচ্ছি। এই বার্তায় কেবল কৃতজ্ঞতাই নয়, ছিল এক ধরনের আত্মমর্যাদার ঘোষণা। নানা প্রতিকূলতা, ভ্রমণের ক্লান্তি এবং বিতর্কের মধ্যেও তারা নিজেদের পেশাদারিত্ব ও সম্মানবোধ ধরে রেখেছে, এই বার্তাটি যেন সেটিই তুলে ধরেছে। এর আগে লস অ্যাঞ্জেলেসেও একই ধরনের একটি বার্তা রেখে গিয়েছিল ইরান। এই দুই শহরে রেখে যাওয়া বার্তাগুলো দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পায়। অনেকেই এটিকে ‘স্পোর্টসম্যানশিপের এক অনন্য উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের যাত্রা শুধু হার-জিতের পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি এমন এক দলের গল্প, যারা মাঠে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলেছে, আবার মাঠের বাইরেও নানা বাস্তবতার সঙ্গে লড়েছে। শেষ পর্যন্ত নকআউটে ওঠা হয়নি, কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইরানের নাম হয়তো মনে থাকবে অন্য এক কারণে। কারণ এই দলের বিশ্বকাপ ছিল গোল, পয়েন্ট আর ফলাফলের চেয়েও অনেক বড় একটি গল্প।