মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৮শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
LIVE
Printed on: October 13, 2026
October 13, 2026
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সংলাপ

Published: October 13, 2026 at 11:58 AM
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সংলাপ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশু সুরক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সদর উপজেলার নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের স্ট্রেংদেনিং সোশ্যাল অ্যান্ড বিহেভিয়ার চেঞ্জ (ঝঝইঈ) প্রকল্পের আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রওশন আরার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জয়নাল আবেদিন। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার বন্দনা সাহা, নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের  সহকারী শিক্ষক মুফতি হানিফ মো. আব্দুল কাদের, হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মাহবুব জন এবং এসএসবিসি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক উত্তম মণ্ডল বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।


সংলাপে প্রজেক্টরের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের কুফল, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে করণীয় এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাল্যবিবাহ পরিস্থিতি তুলে ধরেন এসএসবিসি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক উত্তম মণ্ডল। তিনি বাল্যবিবাহের সামাজিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিকর দিক ব্যাখ্যা করে বলেন, বাল্যবিবাহ একটি শিশুর শিক্ষাজীবন ব্যাহত করার পাশাপাশি তার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ সীমিত করে দেয়। বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষ অতিথি উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার বন্দনা সাহা শিশু অধিকার, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি শিশুদের সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা, নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং শিশুদের প্রয়োজন ও মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শিশুদের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ এবং শিশুদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিশুদের অধিকার সম্পর্কে পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও জানতে ও বুঝতে হবে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধের বিষয়ে বক্তব্য দেন নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুফতি হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল কাদের। তিনি শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন এবং নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে দূরে থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা, যত্ন ও ন্যায়সংগত আচরণ নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করা এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।

প্রধান অতিথি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. জয়নাল আবেদিন শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিদ্যালয় শুধু শিক্ষাদানের স্থান নয়, এটি শিশুদের নিরাপদে বেড়ে ওঠা, অধিকার সম্পর্কে জানা এবং আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ, বাল্যবিবাহের ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং শিশুদের প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনো শিশুর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে তা অবহেলা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। এ জন্য অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোসা. রওশনারা বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অন্যতম দায়িত্ব। বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ—আমাদের বিদ্যালয়ে বাল্যবিবাহ হতে দেব না।” শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

সংলাপে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেয় দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নওশীন জাহান নূপুর। সে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন সম্পর্কে জানা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তার বক্তব্যে উঠে আসে, শুধু আইন প্রণয়ন বা প্রয়োগের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন এবং শিশুদের অধিকার সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা প্রয়োজন। বাল্যবিবাহের ফলে শিশুর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং দেশ গড়ার স্বপ্ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়গুলোও সে তুলে ধরে। পাশাপাশি শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানায়।

সংলাপে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, প্রতিটি শিশুর অধিকার রক্ষা করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশুদের জন্য সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলতে হলে বাল্যবিবাহ, নির্যাতন, বৈষম্য ও সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।