বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এক অভূতপূর্ব ও আশঙ্কাজনক জলবায়ু পরিস্থিতির ব্যাপারে তীব্র সতর্কতা জারি করেছেন। তাদের মতে, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা 'এল নিনো' এখন তীব্র রূপ ধারণ করে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অচেনা পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। জাতিসংঘ এবং তাদের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ১৯৫০ সালের পর থেকে রেকর্ড করা আবহাওয়ার ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে যাচ্ছে চলতি বছরের এই এল নিনো। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাটি স্পষ্ট করে সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই প্রাকৃতিক এল নিনো মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও বহু গুণ বাড়িয়ে তুলবে এবং প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বিপুল পরিমাণে জমানো তাপ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার কারণে পৃথিবীর একটি বিশাল অংশ অস্বাভাবিক ও চরম তাপমাত্রা অনুভব করবে।
জলবায়ু পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক তা প্রকাশ করতে গিয়ে আবহাওয়াবিদ রায়ান মাউ সম্প্রতি সমগ্র গ্রহের একটি জলবায়ু মানচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে জলবায়ু মানচিত্রে পুরো পৃথিবী প্রায় পুরোপুরি লাল রঙে ঢেকে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপদাহের নির্দেশক। তিনি আরও জানান, যুক্ত রাষ্ট্র ছাড়া সমগ্র পৃথিবীতে এই বৈশ্বিক উত্তাপ তীব্র মাত্রায় পৌঁছেছে এবং শীতকাল পর্যন্ত এই এল নিনো সর্বোচ্চ শক্তিতে অবস্থান করবে। রায়ান মাউ বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সেই মূল্যায়নের সাথেও সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে এই ধ্বংসাত্মক এল নিনো ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা সক্রিয় থাকবে।
একই উদ্বেগ প্রকাশ করে আরেক প্রখ্যাত জলবায়ু বিজ্ঞানী জেক হাউসফাদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, চলতি বছরের এল নিনো প্রতিনিয়ত রেকর্ড ভেঙে এক অচেনা ও বিপজ্জনক সীমানায় প্রবেশ করছে। নিনো৩.৪ অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা এখন পর্যন্ত ইতিহাসে রেকর্ড করা যেকোনো পূর্ববর্তী এল নিনো ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি। পরিস্থিতির এই অভাবনীয় ও আশঙ্কাজনক তীব্রতার দিকে ইঙ্গিত করে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ লিওন সাইমনস এই প্রলয়ংকারী আবহাওয়া ঘটনাটিকে সরাসরি সুপার-ডুপার এল নিনো বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তাদের পূর্বাভাসে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে ২০২৬ সালের শেষ মাসগুলোতে পৃথিবীর এক বিশাল এলাকা জুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকার চরম সম্ভাবনা রয়েছে। ডব্লিউএমও উল্লেখ করেছে যে এল নিনো প্রক্রিয়ার প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ মধ্য ও পূর্ব ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মেয়াদের মধ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় রেকর্ড ৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৬.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মূলত এল নিনো হলো স্বাভাবিকভাবে ঘটে যাওয়া 'এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন' চক্রের একটি উষ্ণ পর্যায়, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ফিরে আসে এবং সমগ্র বিশ্বের জলবায়ু ও আবহাওয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে গড় তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বব্যাপী বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হয়ে এক অঞ্চলে চরম খরা আর অন্য অঞ্চলে ভয়াবহ অতিবৃষ্টি ও বন্যার সৃষ্টি হয়।
এই চরম জলবায়ু পরিস্থিতির বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক বিপর্যয় নিয়ে গত মাসে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট ইম্প্যাক্ট ল্যাব-এর গবেষকরা একটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস দিয়েছেন। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে চলে যাওয়া চলতি বছরের এই সুপার-এল নিনো-র ভয়াবহ প্রভাবে জুনের সূচনা থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার অতিরিক্ত মানুষের প্রাণহানি বা অকাল মৃত্যু ঘটতে পারে।