প্রায় এক মাসের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থী প্রার্থী কেইকো ফুজিমোরিকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ। অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে তিনি অল্প ব্যবধানে বামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী রবার্তো সানচেজকে পরাজিত করেছেন। পেরুর নির্বাচনী আদালত অনুমোদিত ফলাফলে দেখা যায়, গত ৭ জুন অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার (রানঅফ) নির্বাচনে ৫১ বছর বয়সী কেইকো ফুজিমোরি ৫০ দশমিক ১৩৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। অপরদিকে, ৫৭ বছর বয়সী রবার্তো সানচেজ পেয়েছেন ৪৯ দশমিক ৮৬৫ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ৫০ হাজারেরও কম। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে অবশেষে জয় পেলেন কেইকো ফুজিমোরি। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির কন্যা। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সংগঠিত অপরাধ, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা দমনে কঠোর অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন। ফল ঘোষণার পর কেইকো ফুজিমোরি বলেন, “আমি দায়িত্ব, বিনয় এবং গভীর কর্তব্যবোধ নিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবো।” তিনি আরও বলেন, “ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিটি দিন জনগণের কথা শোনা, সংলাপ চালিয়ে যাওয়া এবং নতুন সরকারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার একটি সুযোগ।” বিশ্লেষকদের মতে, অল্প ভোটের ব্যবধানে জয় পাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেই তিনি এমন বার্তা দিয়েছেন। অন্যদিকে পরাজিত প্রার্থী রবার্তো সানচেজ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার অভিযোগ, রানঅফ নির্বাচন ‘গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ’ হয়েছে এবং বিশেষ করে বিদেশে বসবাসরত পেরুভিয়ানদের মধ্যে ফুজিমোরির অস্বাভাবিক সমর্থন অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে।
ফল ঘোষণার পর সানচেজের দল নির্বাচনী আদালতের ঘোষণার বিরুদ্ধে আপিল করেছে এবং পুরো নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণায় সাবেক বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী সানচেজ ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংগঠিত অপরাধ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। এসব ইস্যুকে সামনে রেখেই ফুজিমোরি জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন। প্রচারণাকালে তিনি তার বাবার বিতর্কিত রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকেও সামনে আনেন এবং সংগঠিত অপরাধ দমনে সেনাবাহিনীকে আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহারের অঙ্গীকার করেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে বেড়ে যাওয়া চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরি মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচির দায়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। তার শাসনামল ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। কেইকো ফুজিমোরি নির্বাচনী ইশতেহারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি অপরাধে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত বহিষ্কারেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর আগে তিনি ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। প্রতিবারই অল্প ব্যবধানে পরাজিত হন। এবার জয়ী হওয়ার মাধ্যমে তিনি গত এক দশকে পেরুর নবম প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন, যা দেশটির দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্রকেই তুলে ধরে। আগামী ২৮ জুলাই তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা রয়েছে।
লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থার উত্থান
বিশ্লেষকদের মতে, কেইকো ফুজিমোরির বিজয় লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডানপন্থী শক্তির উত্থানের ধারাবাহিকতারই অংশ। সম্প্রতি কলম্বিয়াতেও ডানপন্থী নেতা আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া এল সালভাদরের নাইব বুকেলে এবং ইকুয়েডরের ড্যানিয়েল নোবোয়া’র মতো নেতারাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষমতায় এসেছেন। তাদের অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বর্তমানে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী রাজনীতির প্রধান মুখ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিতব্য ব্রাজিলের নির্বাচনে তাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর পুত্রের মুখোমুখি হতে হবে।